স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বারবাকপুর এলাকায় পৈতৃক জমিজমা নিয়ে দুই আপন ভাইয়ের পরিবারের মধ্যে প্রায় এক দশক ধরে চলে আসা সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদের জেরে অহেতুক তোপের মুখে পড়েছে ঝিকরগাছা থানা পুলিশ। সম্প্রতি সংঘটিত এক হামলার ঘটনায় থানায় নিয়মিত মামলা রুজু হওয়ার পর, ক্ষুব্ধ হয়ে একটি পক্ষ পুলিশের বিরুদ্ধে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমে অসত্য ও তথ্যগোপনমূলক অভিযোগ এনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝিকরগাছা-ছুটিপুর প্রধান সড়ক সংলগ্ন বারবাকপুর মৌজার ৩১৮ খতিয়ানের ৩১২৭ নম্বর দাগের ৬৬ শতক জমিতে ফ্রন্ট সাইড বা সামনের অংশ দখল নেওয়া নিয়ে মূল দ্বন্দের সূত্রপাত। উক্ত জমির মধ্যে নাজমুল আকরাম রকির ৪৫.৪০ শতক এবং তার চাচা মোজাম্মেল হোসেনের ২০.৬০ শতক অংশ (বর্তমানে হেবা সূত্রের মালিক মোজাম্মেলের স্ত্রী) রয়েছে। জমিটির সামনের অংশ কার দখলে থাকবে—এ নিয়ে সৈয়দ আলী বিশ্বাসের ছেলে মোজাম্মেল হোসেন এবং তার প্রয়াত ভাই ইসমাইল হোসেনের পরিবারের মধ্যে গত ১০ বছর ধরে মারামারি ও মামলা-মোকদ্দমা চলছে। স্থানীয়ভাবে বহুবার সালিশ-বিচার হলেও উভয় পক্ষের একরোখা মনোভাবের কারণে কোনো সমাধান হয়নি।
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিকেলে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের সামনে নাজমুল আকরাম রকির ওপর তার চাচা মোজাম্মেল হোসেন চড়াও হন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে আহত নাজমুল ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও মোজাম্মেল হোসেন, তার অপর ভাইয়ের ছেলে জিয়া ও আনোয়ার কে নিয়ে রকির উপর পুনরায় হামলা চালায়। এ ঘটনায় নাজমুল আকরাম রকি বাদী হয়ে ঝিকরগাছা থানায় একটি লিখিত মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-১৬/১৫৪, তারিখ: ২৫/০৭/২০২৬)। পুলিশি তদন্ত, ভুক্তভোগীর মেডিকেল সার্টিফিকেট এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় থানা পুলিশ মামলাটি নথিভুক্ত করে।
মূলত এই মামলা হওয়ার পরেই ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘোরাতে তৎপর হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ মোজাম্মেল হোসেনের পরিবার। গত ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে যশোর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মোজাম্মেল হোসেনের মেয়ে কলেজছাত্রী জান্নাতুন নাহার মোহনা অভিযোগ তোলেন যে, ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে তাদের জমি দখলের সুযোগ করে দিচ্ছেন এবং কোনো আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
তবে অনুসন্ধানে মোহনা পরিবারের দাবির বেশ কিছু গুরুতর অসঙ্গতি ও তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেছে । সংবাদ সম্মেলনে আসামি নাজমুল আকরাম রকিকে বাইরের সন্ত্রাসী ও বিগত সরকারের ক্যাডার বলে দাবি করা হলেও, বাস্তবে সে মোহনার নিজের আপন চাচাতো ভাই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহনা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। থানায় ৮টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন দাবি করলেও প্রতিবেদককে কোনো লিখিত অভিযোগের অনুলিপি দেখাতে পারেননি মোহনা। পুলিশ জানায়, সামান্য বাকবিতণ্ডা হলেই মোহনার পরিবার ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেয়। কিন্তু প্রতিবার পুলিশ গিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার প্রমাণ বা ভিত্তি খুঁজে পায় না।ফলে পুলিশ ফিরে আসে।
ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া জানান, চলতি বছরের ১৯ মে তিনি যোগদানের বহু আগে থেকেই এই জমি সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধ চলে আসছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করলেও কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ওসির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ না নেওয়ার দাবি ভিত্তিহীন উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রেসক্লাবে দেওয়া সংবাদ সম্মেলনের আগে ওই পরিবার তার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি এবং তাদের সাথে কেবল একবারই আপস বৈঠকে কথা হয়েছিল। তিনি জানান আমি যদি ভিত্তিহীন পাল্টা মামলা নিতাম, তাহলে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠতো না। প্রতিবারে তাদের ৯৯৯ এর মাধ্যমে অভিযোগের তদন্তে যেয়ে তাদের পারিবারিক ঝগড়া ছাড়া মামলার নেয়ার মতন কোন কিছুই খুঁজে পাইনি পুলিশ। এক্ষেত্রে পুলিশ কি করতে পারে।পুলিশ তো প্রমাণ ছাড়া কোন কিছু করতে পারেনা।
অন্যদিকে নাজমুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ৫০ বছর আগে তার দাদা জীবিত থাকা অবস্থায় সব জমি বণ্টন করে দিয়ে গেছেন। কিন্তু চাচা মোজাম্মেল হোসেন, ,চাচাতো ভাই জিয়া ও আনোয়ার গং সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে তাদের প্রাপ্য জমি দাবি করছে। তিনি ও তার স্ত্রী দুজনেই চাকরিজীবী এবং তিনি একটি মাদ্রাসার শিক্ষক। মামলায় ফেঁসে গিয়ে নিজেদের বাঁচাতে ওসির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে দাবি তার।
এলাকাবাসীর তথ্যমতে, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই দুই পরিবারের মধ্যে অহেতুক ঝগড়াঝাটি লেগে থাকে এবং তারা একে অপরকে দোষারোপ করে। ভিডিও ক্লিপ বা ছবি যা দেখা যায় তা চার-পাঁচ মাস আগের পুরোনো ঘটনা। মূলত নাজমুলের মামলাটি থানায় গৃহীত হলেও মোহনা পরিবারের কোনো পাল্টা মামলা পুলিশ না নেওয়ায়, তারা পুলিশের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে এবং থানাকে বিতর্কিত করতে এই কৌশল অবলম্বন করেছে বলে তারা মনে করেন। ছবি সংগৃহীত।


