স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরে প্রতারণার একটি মামলার তদন্তকারী সিআইডি কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক তুষার কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, আসামিদের ভয়ভীতি দেখানো, অর্থের বিনিময়ে মামলার মূল অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেওয়া এবং আদালতের অনুমতি ছাড়াই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আসামির মালামাল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মামলার বাদী মাগুরা সদর উপজেলার সত্যপুর গ্রামের মো. হারুন অর রশিদ এসব অভিযোগ করেছেন। তবে অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক তুষার কুমার মন্ডল।
বিজ্ঞাপন
মামলার নথি ও বাদীর বক্তব্য অনুযায়ী, যশোর কোতোয়ালি থানায় ২০২৫ সালের ১১ মার্চ দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা নম্বর-৩৪ দায়ের করা হয়। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডি যশোরের পুলিশ পরিদর্শক তুষার কুমার মন্ডলকে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ইন্টারনেট টাওয়ার স্থাপন এবং ব্যাংক থেকে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কয়েকজন ব্যক্তি বাদীর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা নেন। বাদীর দাবি, নগদ, বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে তিনি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার পর আরও ২০ লাখ টাকা নিয়ে অভিযুক্তদের অফিসে গেলে কৌশলে তাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তিনি অফিসে ফিরে দেখেন, সেটি তালাবদ্ধ এবং সংশ্লিষ্টদের মোবাইল ফোন বন্ধ।
বিজ্ঞাপন
বাদীর অভিযোগ, মামলার অন্যতম আসামি মাহাবুবর রশিদ আজাদ একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতেন এবং ওই নম্বরে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে তিনি এক লাখ টাকা পাঠিয়েছেন। একই সঙ্গে মামলার আরেক আসামির বক্তব্যেও আজাদকে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে দাবি করেন বাদী।
তার অভিযোগ, এরপর বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে আজাদকে মামলা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অর্থের বিনিময়ে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বাদী। এ বিষয়ে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেনের তথ্য যাচাই করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামি শেখ মহিউদ্দিন জনিকে গ্রেপ্তার নিয়েও তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন বাদী। বাদীর দাবি, জনিকে গ্রেপ্তারের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা একাধিকবার খুলনায় অভিযান চালিয়েও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেননি। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে জনির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে গ্রেপ্তার না করার শর্তে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। ওই শর্তে রাজি হয়ে জনির বাবা ও বোনজামাই সিআইডি যশোর কার্যালয়ে এসে তদন্ত কর্মকর্তা তুষার মন্ডলকে এক লাখ টাকা দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে টাকা নেওয়ার সাত-আট দিন পর সাতক্ষীরা জেলা থেকে জনিকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে বাদীর দাবি। গ্রেপ্তারের পর তাকে মারধর না করার জন্য আরও এক লাখ টাকা নেওয়া হয় এবং তিন দিনের রিমান্ড চলাকালে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
বাদীর ভাষ্য, জনিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বলা হয়—টাকা না দিলে তাকে হাতকড়া পরিয়ে খুলনা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হবে এবং আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সামনে তার সম্মানহানি করা হবে। পরে শুক্রবার দিনভর তাকে খুলনা শহরে ঘোরানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন বাদী।
বাদীর অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হলো—সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রসুলপুর গ্রামের একটি তিনতলা বাড়ির নিচতলায় থাকা মামলার আসামিদের অফিস থেকে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার ঘটনা। বাদীর দাবি, ওই অফিসটি আসামি শেখ মহিউদ্দিন জনি ও মাহাবুবর রশিদ আজাদ ব্যবহার করতেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে সেখান থেকে একটি এসি, একটি ফ্রিজ, একটি আলমারি, এক সেট সোফা, দুটি খাট, তিনটি ফ্যানসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ট্রাকে করে নিয়ে যান তদন্ত কর্মকর্তা তুষার কুমার মন্ডল।
অভিযোগ রয়েছে, আদালতের কোনো আদেশ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়াই এসব মালামাল সরিয়ে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার গ্রামের বাড়িতে রাখা হয়েছে। তবে এসব মালামাল মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে আদালতের নথি বা জব্দ তালিকা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি বাদীর।
বাদী প্রশ্ন তুলেছেন, আদালতের অনুমতি ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে এসব মালামাল সরিয়ে নিতে পারেন কি না এবং সরিয়ে নেওয়া মালামাল বর্তমানে কোথায় ও কী অবস্থায় রয়েছে—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বাদী আরও অভিযোগ করেন, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও অর্থের বিনিময়ে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার ব্যবহৃত একটি বিকাশ নম্বরেও ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাদী মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন যাচাই এবং মালামাল সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডি যশোরের পুলিশ পরিদর্শক তুষার কুমার মন্ডল সাংবাদিকদের বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগই সত্য নয়। তিনি বলেন, “এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সবই মিথ্যা ও বানোয়াট। একটি মহল এসব মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে।” ছবি সংগৃহীত।


