রফিক মণ্ডল,কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ:
সাংবাদিকতার মূল চেতনা যেখানে সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসঙ্গতি প্রকাশ করে নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সেখানে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে এখন স্বয়ং ‘সাংবাদিক পরিচয়’ ও এর পেশাগত মর্যাদা নিয়েই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।
উপজেলাটিতে একাধিক সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেস ক্লাবের কার্যক্রম দৃশ্যমান হলেও, সংবাদকর্মীর পরিচয় ব্যবহার করে কারও কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার গুরুতর অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি মাদক মামলায় কোটচাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে এবং সচেতন নাগরিক মহল পেশার মর্যাদা রক্ষায় নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ আত্মশুদ্ধির দাবি তুলেছেন।
কোটচাঁদপুর পাঁচটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। ১৪ সেপ্টেম্বর কোটচাঁদপুর প্রেস ক্লাবে প্রয়াত দুই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শেখ নজরুল ইসলাম ও খন্দকার শামসুজ্জামানের স্মরণসভায় তাঁদের বস্তুনিষ্ঠ ও সততাপূর্ণ সাংবাদিকতার কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, সেই প্রবীণদের রেখে যাওয়া উজ্জ্বল ঐতিহ্যের সাথে বর্তমানের একশ্রেণীর সাংবাদিক নামধারীদের চালচলনের বিপুল ফারাক তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও পুলিশের সাথে টানাপোড়েন:
সম্প্রতি কোটচাঁদপুরে সাংবাদিক ও পুলিশের পেশাগত সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় কোটচাঁদপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের ফোনকল রিসিভ না করা ও তথ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান; যা নিয়ে প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এর পরপরই ২৪ সেপ্টেম্বর পৌর এলাকার একটি চায়ের দোকান থেকে ৩৯ পিস ইয়াবাসহ কোটচাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি খন্দকার আব্দুল্লাহ বাশারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। যদিও আইনগত নীতি অনুযায়ী আদালতে চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই অপরাধী বলা যায় না, তবুও এ ঘটনা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সততা ও নৈতিকতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
সংগঠন বনাম পেশাগত মানদণ্ড:
স্থানীয় প্রবীণ ও পেশাদার সাংবাদিকদের মতে, একাধিক সাংবাদিক সংগঠন থাকা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সংবাদপত্রের পরিচয়পত্র বা সংগঠনের পদপদবি পেশাগত দায়িত্বের বদলে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় বা বেআইনি কাজের সুরক্ষা কবচ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কে নিয়মিত মূলধারার গণমাধ্যমে কাজ করছেন, কার নিয়োগপত্র বা পরিচয়পত্রের বৈধতা আছে এবং কার মূল পেশা কী—এসবের একটি বস্তুনিষ্ঠ যাচাই ব্যবস্থা থাকা জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্বচ্ছতা ও কঠোর ব্যবস্থার আকুতি:
কোটচাঁদপুরের সুশীল সমাজ ও সচেতন মহল মনে করেন, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিজস্ব আচরণবিধি জোরদার করা উচিত। কার্ড বা সদস্যপদ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশাপাশি ভুঁইফোড় সাংবাদিকদের চিহ্নিত করতে হবে। একইভাবে প্রশাসনের প্রতিও তাঁদের আহ্বান—আইনের কাছে সবাই সমান। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কেউ অপরাধে জড়ালে যেমন কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি কোনো সৎ সংবাদকর্মী যেন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কোটচাঁদপুরে এখন সময়ের দাবি—কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে একটি সার্বিক আত্মশুদ্ধি প্রক্রিয়া চালু করা। কারণ সাংবাদিকের আসল পরিচয় কোনো সংগঠনের পদ বা ফিতা ঝোলানো কার্ড নয়, বরং তাঁর সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল লেখনী। ছবি গুগল ম্যাপ থেকে সংগৃহীত।
