স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক, বৃহত্তর যশোরাঞ্চলের মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) প্রধান এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি আর নেই। আজ শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) সকালে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট যশোর জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮১ বছর।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে হার্ট, কিডনি, তীব্র শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিল রোগে ভুগছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী এবং একমাত্র পুত্রসন্তান রাজেন আলী রাজু আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। বাবার এই শেষ সময়ে কানাডা থেকে দেশে ফিরে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও দেখভাল করছিলেন তাঁর একমাত্র প্রবাসী কন্যা ফারজানা আলী।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ মে শহরের রেলবাজারস্থ নিজ বাসভবনে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন আলী হোসেন মনি। তৎক্ষণাৎ তাঁকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাজধানীর ধানমন্ডি পপুলার হসপিটালে নেওয়া হয়েছিল। ঢাকায় চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হলে তাঁকে পুনরায় যশোরে নিয়ে আসা হয়।
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ গত সোমবার তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে আবারও যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরদিন মঙ্গলবার রাতেই তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সকালে এই মহান সূর্যসন্তান শেষ বিদায় নেন।
মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো যশোরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। বর্তমানে তাঁর মরদেহ শহরের রেলবাজার এলাকার নিজ বাসভবনে সর্বস্তরের জনগণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছে। আজ শুক্রবার বাদ আসর যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে মরহুমের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় (গার্ড অব অনার) নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কাজীপুর গ্রামে পৈতৃক পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে রেলবাজারের বাসভবনে শেষ শ্রদ্ধা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ছুটে যান বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক নার্গিস বেগম, জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা একরাম উদ-দৌলাসহ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রখর রাজনৈতিক মেধার পরিচয় দেন। ৬০-এর দশকে তৎকালীন যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (তখন সভাপতি ছিলেন একরামুল কবির)। ১৯৬৯ সালে তিনি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রথম ব্যাচের যোদ্ধা হিসেবে ভারতের দেরাদুনে উচ্চতর সামরিক ও গেরিলা ট্রেনিংয়ে অংশ নেন এবং বৃহত্তর যশোরাঞ্চলে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ‘মুজিব বাহিনী’র প্রধান হিসেবে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন।
দেশ স্বাধীনের পর সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম প্রধান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি দীর্ঘ সময় জেলা জাসদের সভাপতি এবং পরবর্তীতে জাসদ (ইনু)-র জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে জাসদের একাংশ ঐক্যবদ্ধ হলে আলী হোসেন মনি মূলধারার রাজনীতি তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত হন। জেলা আওয়ামী লীগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদে না থাকলেও যশোরাঞ্চলের প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে দলটির মূল নীতিনির্ধারক ও প্রচারণার প্রধান কণ্ডারি ছিলেন তিনি।
এদিকে, কিংবদন্তি এই বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে গভীর শোক, দুঃখ ও মাগফিরাত কামনা করেছেন কেন্দ্রীয় জাসদ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম, জাসদ নেতা আবুল কায়েসসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, “আলী হোসেন মনির মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও আজীবন সংগ্রামী নেতাকে হারাল, যা কখনো পূরণ হবার নয়।” ছবি সংগৃহীত।
