চৌগাছায় ভূগর্ভস্থ পানির পাশাপাশি এবার ধানেও  মিললো অতিরিক্ত আর্সেনিক!

চৌগাছায় ভূগর্ভস্থ পানির পাশাপাশি এবার ধানেও মিললো অতিরিক্ত আর্সেনিক!

ইমাম হোসেন সাগর, চৌগাছা (যশোর) :

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তোয়াক্কা না করে দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্তবর্তী উপজেলা চৌগাছায় মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের ভয়াবহতাপূর্ণ উপস্থিতি জনজীবনকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। মানবদেহের জন্য পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে যেখানে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য এক (০.০১২) মিলিগ্রাম এবং সরকারি মানদণ্ডে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ মিলিগ্রাম নির্ধারিত, সেখানে যশোরের চৌগাছা উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানিতে গড়ে ২০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত আর্সেনিকের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে। শুধু পানীয় জলই নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত সংকটের প্রভাব এবার সরাসরি খাদ্যশৃঙ্খলে এসে পড়েছে। এখানকার উৎপাদিত ধানেও সহনশীল মাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণে আর্সেনিক ধরা পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সিএসি (কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন)-এর নীতিমালা অনুযায়ী, চাল বা ধানে আর্সেনিকের সহনশীল বা নিরাপদ মাত্রা ধরা হয় শূন্য দশমিক ৩৫ পিপিএম (পিম), যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়। অথচ চৌগাছার বিভিন্ন এলাকার ধানে এই নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি অর্থাৎ প্রায় ৫৬ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং জনস্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখতে জাপানের জাইকা (JICA) এবং জেএসটি (JST)-এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক’ কৃষিজমিতে সেচ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ আর্সেনিকমুক্ত বা সহনশীল মাত্রার ধান উৎপাদনের অভিনব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ধান ও ভাতে আর্সেনিকের মাত্রা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখতে সেচ ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন বা পানি নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। এজন্য তারা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) কর্তৃক উদ্ভাবিত এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর ধান (সানরাইজ) প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত বিশেষ ‘থ্রিএফফোরডি’ (৩ দিন জমি ভেজানো এবং ৪ দিন জমি শুকানো) পদ্ধতি কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় করে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

চৌগাছা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার মাঠে মোট ১২টি সুনির্দিষ্ট মডেল প্লট তৈরি করা হয়েছে। এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে চৌগাছা পৌরসভার হুদোপাড়া, চৌগাছা ইউনিয়নের কয়ারপাড়া, সিংহঝুলী ইউনিয়নের মাজালি, ফুলসারা ইউনিয়নের আড়ারদহ, জগদীশপুর ইউনিয়নের মাড়ুয়া, পাতিবিলা ইউনিয়নের সাদিপুর, হাকিমপুর ইউনিয়নের বকশিপুর, নারায়নপুর ইউনিয়নের নারায়নপুর, স্বরুপদাহ ইউনিয়নের স্বরুপদাহ, সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের মাকাপুর, ধুলিয়ানী ইউনিয়নের কুষ্টিয়া এবং পাশাপোল ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রাম। এসব প্লটের মাধ্যমে বর্তমানে চৌগাছার মোট ১৪৪ জন কৃষক এই নিরাপদ ধান উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আছেন। এছাড়া আগামী ইরি-বোরো মৌসুমে নিজ উদ্যোগে এই পদ্ধতি চালুর জন্য প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৬০ জন সেচপাম্প মালিককে প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কর্মশালার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের উপজেলা কো-অর্ডিনেটর আমিরুল ইসলাম জানান, নিরাপদ ও পুষ্টিকর চালের ভাত খাওয়া নিশ্চিত করতেই আর্সেনিক সহনশীল মাত্রায় ধান উৎপাদন করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা প্রধানত দুটি কৌশলে কাজ করছি, যার মূল ভিত্তি হলো জমির পানির ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। এই থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি ব্যবহার করলে যেমন মাটির বিষাক্ততা কমে, তেমনি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ সেচের পানি সাশ্রয় হয় এবং প্রায় ৮ শতাংশ বেশি ধান উৎপাদন করা সম্ভব হয়।” সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইরি-বোরো মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়লে আর্সেনিকের ঘনত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে জমিতে সবসময় জলাবদ্ধতা রাখা হয়, যা ধান গাছের মাধ্যমে আর্সেনিক শোষণ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু নতুন এই পদ্ধতিতে ৩ দিন জমিতে পানি রেখে পরবর্তী ৪ দিন জমি শুকানো হলে মাটির রেডক্স পটেনশিয়াল বৃদ্ধি পেয়ে অক্সিডেটিভ পরিবেশ তৈরি হয়; ফলে ধান গাছ কর্তৃক আর্সেনিক শোষণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায় এবং চালে ক্ষতিকর অজৈব আর্সেনিকের মাত্রা কমে আসে।

ইতিমধ্যে এই পদ্ধতির সুফল পেতে শুরু করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। আড়ারদহ গ্রামের মডেল প্লটের কৃষক ইমদাদুল হক ও মাজালি গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান তপন জানান, উৎপাদিত ধানে যে আর্সেনিক থাকতে পারে, তা তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল। তবে সংস্থার পরামর্শে সেচ দেওয়ার প্রচলিত নিয়ম বদলে থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি অনুসরণ করায় তাঁরা এখন জমিতে দারুণ ভালো ফল পাচ্ছেন।

সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ফেরদৌসী খাতুন জানান, ধান বা চালে আর্সেনিক জমা হওয়ার বিষয়টি মোকাবিলায় সরাসরি কোনো সরকারি প্রকল্প না থাকলেও ভূগর্ভস্থ পানি বিশুদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণে সরকারি নানা পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। বর্তমানে উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ৯০টি অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে নিয়মিত পানি সংগ্রহ করে আঞ্চলিক পানি পরীক্ষাগারে পাঠানো হয় এবং যে সমস্ত টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি পাওয়া যায়, সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে পানি শোধনের জন্য ফিল্টার বা ভ্যাসেল সরবরাহ করা হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমী বলেন, আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীদের বর্তমানের কোনো হালনাগাদ বা সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে না থাকলেও পূর্বের বিভিন্ন জরিপে উপজেলায় প্রায় ১৫শ আর্সেনিক রোগী চিহ্নিত করা হয়েছিল। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ধরনের রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসা নিতে আসেন। প্রাথমিকভাবে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ পানি পান করলে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। চিকিৎসকরা এই সমস্যাকে অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারজানা ইসলাম জানান, ধানে আর্সেনিকের ক্ষতিকর মাত্রা রোধে একটি বেসরকারি সংস্থা মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বলে তিনি অবগত হয়েছেন। যদিও সরকারিভাবে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প শুরু হয়নি, তবুও পানিতে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে অগভীর নলকূপ বিতরণ এবং শোধনমূলক ভ্যাসেল দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, “আর্সেনিক সমস্যা এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতা। আমরা প্রতিদিন যে নলকূপের পানি ব্যবহার করছি, তার একটি বড় অংশই এখন পানের উপযোগী নয়। তাই জনস্বার্থে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে আরও অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।” ছবি প্রতিবেদক।

আরো পড়ুন

বেনাপোলে ২৮ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ী, কম্বল ও কসমেটিকস জব্দ

চৌগাছায় অনলাইন জুয়ায় বাধা দেওয়ায় স্ত্রীকে মারধর : কালেক্টরেট অফিস কর্মী আরিফের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযো...

এইচএসসি ফলাফলে ঝিকরগাছায় আবারও উপজেলার শীর্ষে সম্মিলনী মহিলা ডিগ্রি কলেজ

যশোরে ২৪ ঘণ্টায় নতুন ২৯ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি : মোট আক্রান্ত ছাড়াল ২২শ

কোটচাঁদপুরে মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা!

এইচএসসিতে আবারও উপজেলার সেরা চৌগাছা তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজ

মণিরামপুরে ১ কেজি গাঁজাসহ কেশবপুরের দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

যশোর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে কন্দাল ফসলের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আঞ্চলিক কর্মশালা

এইচএসসির ফলাফলে বিপর্যয়ে যশোর বোর্ড !

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *