স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
কারাগারের উঁচু চার দেয়াল হয়তো মানুষের জীবনের বন্দিত্ব ও শাস্তির কঠোর বাস্তবতার প্রতীক, কিন্তু মমতা, স্নেহ ও মানবিকতার যে কোনো দেয়াল হয় না—তারই এক অনন্য ও স্পর্শকানি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাতে ঝিনাইদহ থেকে খুলনা নেওয়ার পথে চলন্ত অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর সন্তান প্রসব করা হত্যা মামলার বন্দি নারী বৃষ্টি খাতুন (১৯) ও তার নবজাতক সন্তানকে পরম মমতায় বরণ করে নিয়েছে যশোর জেলা কারাগার প্রশাসন।
বিজ্ঞাপন
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার দৌলতপুর পালপাড়ার রবিউল ইসলামের কন্যা ও হত্যা মামলার এজাহারনামীয় হাজতি আসামি বৃষ্টি খাতুনকে (হাজতি নং-৩৮০/২৬) উন্নত চিকিৎসার জন্য ঝিনাইদহ থেকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছিল। পথিমধ্যে রাত আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্সটি যশোর সদর উপজেলার চুরামনকাটি এলাকায় পৌঁছালে তাঁর আকস্মিক তীব্র প্রসববেদনা শুরু হয়। একপর্যায়ে পরম করুণাময়ের অশেষ রহমতে চলন্ত গাড়ির ভেতরেই তিনি একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।
পরবর্তীতে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে রাত ৯টার দিকে পুলিশ পাহারায় তাঁদের যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এসে লেবার ওয়ার্ডে নিবিড় পর্যবেক্ষণে ভর্তি করা হয়।
অ্যাম্বুলেন্সে ফুটফুটে শিশুটির জন্মের বার্তা পাওয়া মাত্রই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেয়। প্রসূতি মা ও সদ্যজাত শিশুর জরুরি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাল বিলম্ব না করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ছুটে যায় । হাসপাতালে পৌঁছে নবজাতকের জন্য তাৎক্ষণিক নতুন জামাকাপড়, তোয়ালে, মশারি, বিছানাপত্র, ন্যাপকিন, ডায়াপার, অলিভ অয়েলসহ প্রয়োজনীয় শিশুসামগ্রী প্রদান করেন তিনি।
শুধু প্রয়োজনীয় সামগ্রীই নয়, এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও শিশুটির আগমনকে আনন্দময় ও স্মরণীয় করে রাখতে প্রসূতি মাকে ফুলের তোড়া দিয়ে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান জেল কর্মকর্তারা। সেই সাথে উপস্থিত সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়।
সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক আবেগঘন বার্তায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জনপ্রিয় ও মানবিক জেলার আবিদ আহমেদ বলেন, “জীবনের পথচলা কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়, যা সব বাস্তবতা ও প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে মানুষের হৃদয়ে আনন্দের আলো ছড়িয়ে দেয়। কারাপ্রাচীর হয়তো একটি বিশেষ ব্যবস্থার প্রতীক, কিন্তু ভালোবাসা ও মানবিকতার কোনো সীমানা বা দেয়াল নেই। আজকের এই ছোট্ট অতিথির শুভ আগমন যেন আবারও সেই পরম মানবিকতার কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল। একটি নতুন প্রাণের আগমন মানেই নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন এবং সুন্দর সম্ভাবনার সূচনা। আমাদের প্রত্যাশা, এই শিশুটি সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে একদিন আলোকিত ও সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।”
বর্তমানে যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা বৃষ্টি খাতুন ও তাঁর নবজাতক পুত্রসন্তান উভয়েই পুরোপুরি সুস্থ ও শঙ্কা মুক্ত রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা।
একজন বন্দি প্রসূতি ও তার নবজাতকের প্রতি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার এবং জেলার আবিদ আহমেদের এই অনবদ্য ও সহমর্মিতাপূর্ণ উদ্যোগ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত ও আলোড়িত হয়েছে। ছবি সংগৃহীত।


