স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নিভৃতপল্লী বাঁকড়া ইউনিয়নের দিগদানা মন্দির পাড়া গ্রামে এক বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী তরুণীকে পৈশাচিক নির্যাতন ও পরবর্তীতে জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানোর ন্যাক্কারজনক ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার ২৫ বছর বয়সী এই ভুক্তভোগী সালেহা খাতুন কোনো সাধারণ তরুণী নন; তিনি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উঁচিয়ে ধরা এক সফল অলিম্পিয়ান ও রৌপ্যপদকজয়ী অ্যাথলেট।
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক পদকজয়ী সালেহার পরিচয় ও প্রতিক্রিয়া: ঝিকরগাছা প্রেস ক্লাব কার্যালয়ে এসে ‘বাবর আলী সরদার বিশেষ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’-এর নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট সমাজসেবক প্রবাস ফেরত মো: আব্দুল আলিম ঘটনার তীব্র ধিক্কার জানান। তিনি নিশ্চিত করেন, সালেহা খাতুন ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক দুবাই অলিম্পিক ও ভারতের চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারী দুজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সালেহা ছিলেন অন্যতম। ৬০টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে তিনি দেশের সেরা এবং সামগ্রিক বিচারে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে আন্তর্জাতিক রৌপ্যপদক ছিনিয়ে এনে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করেন।
বিজ্ঞাপন
এমন আন্তর্জাতিক কৃতি খেলোয়াড় নির্মম নির্যাতনের শিকার হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আব্দুল আলিম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট বিচার দাবি করেন। ঘটনার পর তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক স্বর্ণালী ইয়াসমিনের নেতৃত্বে সহকারী প্রধান শিক্ষক রেহেনা খাতুন, সহকারী শিক্ষক এনামুল হোসেন, সিনিয়র শিক্ষক শাফিয়া খাতুন ও সহকারী শিক্ষক ফারজানা ববি ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিখরচায় আইনি সহায়তার দায়িত্ব নেন। পাশাপাশি ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অবিলম্বে অপরাধীকে গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বজন চক্র’-এর নির্বাহী পরিচালক প্রভাষচন্দ্র ভক্ত।
ঘটনার পেছনের পৈশাচিকতা ও আড়াল করার চেষ্টা: ভুক্তভোগীর হতভাগী মা ছবি বেগম (৫৫)—যাঁর তিন সন্তানের মধ্যে এই মেয়েসহ বড় ছেলেও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী—অশ্রুসজল চোখে জানান, অভিযুক্ত লম্পট হায়দার আলী (৪৫) তাঁদের আপন নিকটাত্মীয় (ভিকটিমের মায়ের আপন চাচাতো ভাই অর্থাৎ সালেহার ‘মামা’)। সরলতার সুযোগ নিয়ে হায়দার আলী মেয়েটির ওপর এই পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। কিছুদিন আগে শারীরিক পরিবর্তন দেখে বাঁকড়া বাজারের ‘একতা মেডিকেল সার্ভিসে’ আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হলে ধরা পড়ে সালেহা ৪ মাস ১০ দিনের অন্তঃসত্ত্বা। পরবর্তীতে আকার-ইঙ্গিতে সালেহা অভিযুক্ত হায়দারের দিকে আঙুল তোলে।
বিষয়টি নিয়ে হায়দারের প্রবল চাপ ও সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে বাধ্য হয়ে ধামাচাপা দিতে রাজি হন তার মা। তবে একতা মেডিকেল সার্ভিসেসের গাইনি চিকিৎসক ডা: ফেরদৌস ফারজানা ও পরিচালক আরিফ বিল্লাহ স্বামীহীন অবস্থায় অবৈধ গর্ভপাত করাতে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে ওই ক্লিনিকের নার্স খাদিজা বেগমের মধ্যস্থতায় শার্শা উপজেলার সাতমাইল বাজারের ‘মাতৃসেবা’ ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয় ভুক্তভোগীকে। সেখানে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মোটা অঙ্কের গোপন চুক্তিতে জোরপূর্বক সালেহার গর্ভপাত ঘটানো হয়।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসা ও বর্তমান চিত্র: গর্ভপাতের গোপন চুক্তির ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে ৮০ হাজার টাকা দিতে অস্বীকার করায় বিষয়টি গোপন থাকেনি। গ্রামবাসীর মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে গ্রাম্য সালিশে দরকষাকষিকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে মারামারি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ঘটনা জানাজানি হতেই লম্পট হায়দার আলী এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করে।
অভিযুক্ত মাতৃসেবা ক্লিনিকের পরিচালক নাসরিন সুলতানা নিজের অপরাধ ঢাকতে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং তাঁর নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি (এস.এম.এফ.বি) ব্যবহারের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি নিরুত্তর থাকেন। এদিকে বাঁকড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ কাজী মো: শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাঁকড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাস্টার আনিস উর রহমান ঘটনাটিকে ‘মানবিকতার চরম পৈশাচিকতা’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। কোনোপ্রকার মামলা না হলেও আন্তর্জাতিক পদকজয়ী এই বাকপ্রতিবন্ধী অ্যাথলেটের ওপর অমানবিক অত্যাচারের বিচারে পুরো দিগদানা গ্রামবাসী একাট্টা হয়ে অভিযুক্ত হায়দার আলীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার রয়েছেন। ছবি সংগৃহীত।

