স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১৫ টাকা কেজি দরে সাধারণ মানুষের মাঝে সরকারের নির্ধারিত চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অক্টোবর মাসের নির্ধারিত চাল উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ না করে তা গোপনে খোলাবাজারে বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় অভিযুক্ত ডিলারের বিতরণসংক্রান্ত সমস্ত কাগজপত্র জব্দ করা হয় এবং পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে জেলা প্রশাসকের বিশেষ নির্দেশে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দায়ান আমিনের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুজ্জামান সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও অভিযোগ থেকে জানা যায়, কাশিমপুর ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বরাদ্দকৃত চাল বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিলার শামীম হোসেনের বিরুদ্ধে অক্টোবর মাসের চাল উপকারভোগীদের সঠিকভাবে না দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রির পাঁয়তারা ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন স্থানীয় বেশ কয়েকজন সুবিধাভোগী। এছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ডিলার পয়েন্ট ও গুদাম বিজয়নগর এলাকায় থাকার কথা থাকলেও তা অনুমতি ছাড়াই অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। এসব বিষয়ে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে সরেজমিন তদন্তে নামে ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রথমে নির্ধারিত এলাকা বিজয়নগরে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে কোনো ডিলার পয়েন্টের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে অভিযুক্ত ডিলার শামীম হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান যে তাঁর ডিলার পয়েন্টটি খয়েরতলা বাজার এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযানকারী দল খয়েরতলা পুরাতন স্টেশনের পাশে অবস্থিত ওই ডিলার পয়েন্টে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। সেখানে উপস্থিত ডিলারের সামনেই বেশ কয়েকজন উপকারভোগীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁদের মধ্যে অনেকেই অক্টোবর মাসের বরাদ্দকৃত চাল পাননি বলে সরাসরি অভিযোগ করেন। ডিলারের চাল বিতরণসংক্রান্ত খাতা ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে কার্যক্রমে বেশ কিছু অসংগতি ও গরমিল পান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরবর্তীতে ডিলারের কার্যক্রমের বৈধ সব নথিপত্র ও কাগজপত্র জব্দ করা হয়।
অভিযানের বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দায়ান আমিন জানান, প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে তদন্ত পরিচালনা করা হয়েছে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ডিলার পয়েন্ট বিজয়নগরে থাকার কথা থাকলেও সেখানে সেটি পাওয়া যায়নি, বরং খয়েরতলা পুরাতন স্টেশন এলাকায় এর সন্ধান মেলে। উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলে চাল বিতরণে স্পষ্ট অসংগতি পাওয়া গেছে এবং অনেকে চাল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করার পর তাঁর নির্দেশে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত ও চূড়ান্ত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ডিলার শামীম হোসেন। তাঁর দাবি, যথাযথ কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে অবহিত ও নিয়ম মেনেই ডিলার পয়েন্ট স্থানান্তর করা হয়েছে। মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ ও দ্বন্দ্বের জেরে একটি প্রতিপক্ষ কুচক্রী মহল তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি বরাদ্দের চাল খোলাবাজারে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই দাবি করে তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে চাল আত্মসাতের অভিযোগের কোনো সত্যতা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। তাঁকে সামাজিকভাবে হয়রানি ও পরিবারের সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, জনবান্ধব খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় কাশিমপুর ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রত্যেকে মাত্র ১৫ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল পাওয়ার কথা। সেই হিসাবে একজন কার্ডধারী উপকারভোগী মাত্র ৪৫০ টাকায় ৩০ কেজি চাল পাওয়ার অধিকারী। জনকল্যাণমূলক এই কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য জেলা ও উপজেলা খাদ্য বিভাগকে নিয়মিত তদারকি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের গুরুত্বপূর্ণ পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মণিরামপুর উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক অতিরিক্ত দায়িত্বে থেকে যশোর সদরের এই বিশাল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। একজনমাত্র কর্মকর্তার অধীনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলার অতিরিক্ত কার্যক্রম পরিচালনার কারণে প্রশাসনিক তদারকি ও কার্যক্রমে নানাবিধ জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ছবি সংগৃহীত।

