স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণা ও অবৈধ পণ্য খালাসের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এরই ধারাবাহিকতায় বন্দরের ২৯ নম্বর শেড থেকে শুল্ক পরিশোধ না করেই তিন ট্রাক মূল্যবান পণ্য বের করে নিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।
বিজ্ঞাপন
একটি গোয়েন্দা সংস্থার সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি উন্মোচিত হওয়ার পর দায়িত্ব অবহেলার দায়ে কাস্টমসের দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে (এআরও) তাৎক্ষণিক ‘ক্লোজ’ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ক্লোজ হওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন— সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) তরিকুল ইসলাম এবং শহিদুল ইসলাম। কাস্টমসের সহকারী কমিশনার মুক্তা চৌধুরী স্বাক্ষরিত দাপ্তরিক প্রজ্ঞাপনে এই প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
কাস্টমস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যবর্তী সময়ে বেনাপোল বন্দরের ২৯ নম্বর শেড থেকে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তিনটি ট্রাকে ভর্তি পণ্য বাইরে বের করে নেওয়া হয়। পণ্যবাহী ট্রাক তিনটির নম্বর— যশোর-ট-১১-৩১৩৩, ঢাকা মেট্রো-ট-২০-৮৩৪৯ এবং ঢাকা মেট্রো-ট-২২-৭৪৭১।
ঢাকার মৌলভীবাজার এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সাদিয়া এন্টারপ্রাইজ’ ভারতের দুটি ট্রাকে করে এসব পণ্য আমদানি করেছিল, যার খালাসের দায়িত্ব পালন করছিল ‘প্রত্যয় এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি স্থানীয় সিএন্ডএফ এজেন্ট।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, বন্দর ও কাস্টমসের একটি প্রভাবশালী অসাধু চক্রের যোগসাজশে সামাদ, আজিম ও হিরু নামের কয়েক ব্যক্তির নেতৃত্বে দীর্ঘ দিন ধরে এই শুল্ক ফাঁকির বাণিজ্য চলছে। উচ্চ শুল্কের শাড়ি, থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, কেমিক্যাল ও কসমেটিকস সামগ্রী কম শুল্কের পণ্য হিসেবে দেখিয়ে কিংবা নথি ছাড়াই পোর্ট থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, যা সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতিসাধন করছে।
এদিকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মী, সশস্ত্র আনসার ও একাধিক সিসিটিভি নজরদারির মধ্যেও সশরীরে কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কীভাবে সকালেই তিন ট্রাক পণ্য গায়েব হয়ে গেল—তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, শুধু দুজন নিচের স্তরের কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও বন্দর কাস্টমসের উর্ধ্বে থাকা মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে হবে।
অন্যদিকে, বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এলাকায় ‘ল্যাগেজ পার্টি’ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন শত শত ভারতীয় নাগরিক পাসপোর্ট ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশের নামে অতিরিক্ত লাগেজ এনে নোম্যান্সল্যান্ডেই সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিচ্ছে। সম্প্রতি কাস্টমস ভবনের জানালার কাচ খুলে অবৈধ পণ্য আনা-নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
এ বিষয়ে বেনাপোল পোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশরাফ হোসেন জানান, “ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও অভিযোগগুলোর বিষয়ে পুলিশ অবগত। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে লিখিত অভিযোগ দিলে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
সম্মিলিত ব্যবসায়ীদের দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং এনএসআই ও ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেনাপোলের এই শুল্ক ফাঁকির সিন্ডিকেট সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। ছবি সংগৃহীত।


