ফেসবুক পেজ খুলেই সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি!

ফেসবুক পেজ খুলেই সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি!

বিশ্লেষণধর্মী মতামত প্রতিবেদন

রফিক মন্ডল,বিশেষ প্রতিনিধি, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ)

সাংবাদিকতা একটি অত্যন্ত মহান, সুমহান ও দায়িত্বশীল পেশা। সমাজের লুকিয়ে থাকা নানা অসংগতি তুলে ধরা, অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করাই একজন প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকের মূল দায়িত্ব। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেবল একটি ফেসবুক পেজ খুলেই একশ্রেণির অসাধু ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্ম ও অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নানা অজুহাতে ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি এবং ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের গুরুতর অভিযোগ উঠছে। এই ধরনের অপতৎপরতার ফলে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই বিব্রত হচ্ছে না, বরং প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে পুরো সাংবাদিক সমাজের পবিত্র মর্যাদা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা।

বর্তমান যুগে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুবাদে যে কেউ খুব সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পেজ খুলে সংবাদ প্রচার শুরু করতে পারেন। এটি গণমাধ্যমের আধুনিক বিকাশ ও প্রসারের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলেও, এর সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ সাংবাদিকতার এই মহান পরিচয়টিকে ব্যক্তিগত ফায়দা ও সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। কোথাও কোনো অনিয়মের তথ্য বা সত্য তুলে ধরার পরিবর্তে ব্ল্যাকমেইল করে সুবিধা আদায়, কোথাও কাল্পনিক সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে অবৈধ অর্থ দাবি, আবার কোথাও ভুয়া পরিচয়পত্র দেখিয়ে নিরীহ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে হেনস্তা করার মতো ঘটনাও প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা ও প্রমাণ সাপেক্ষে এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত তৎপরতা রোগী, তাদের স্বজন এবং সামগ্রিক চিকিৎসাসেবার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই এ ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

একজন প্রকৃত ও সৎ সাংবাদিকের মূল পরিচয় তাঁর কাজের স্বচ্ছতা, সততা, পেশাগত দক্ষতা ও গভীর দায়িত্ববোধে নিহিত। সাংবাদিকতা যেমন কাউকে কাউকে ভয় দেখানোর লাইসেন্স দেয় না, তেমনি ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের কোনো হাতিয়ারও নয়। সংবাদ সংগ্রহের আইনগত অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সেই অধিকারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত রয়েছে নৈতিকতা, পেশাগত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি। কেবল একটি অনলাইন পেজ বা ফেসবুক আইডি থাকলেই কেউ রাতারাতি পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে গণ্য হতে পারেন না। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা এবং পেশাগত পরিচয়ের সত্যতা যাচাই করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা দরকার যে অনলাইন সাংবাদিকতাও বর্তমান যুগের সাংবাদিকতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই শুধু ফেসবুকভিত্তিক সংবাদমাধ্যমকে সামগ্রিকভাবে ছোট না করে, এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপেশাদার ও অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।

হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কর্তৃপক্ষেরও এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন থাকা প্রয়োজন। সাংবাদিক পরিচয়ে কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করলে তাঁর অফিশিয়াল পরিচয় ও সংবাদমাধ্যমের বৈধতার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত। যদি কোনো ব্যক্তি অনৈতিক সুবিধা বা চাঁদা দাবি করেন, তবে আতঙ্কিত না হয়ে প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অযথা বাধার মুখে পড়তে না হয়, সেটিও সংশ্লিষ্ট সবার নিশ্চিত করা উচিত।

এ ধরনের অপরাধমূলক অপতৎপরতা চিরতরে বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ও জোরালো উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন। সাংবাদিক পরিচয়ে কেউ যদি চাঁদাবাজি, প্রতারণা কিংবা কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন, তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরদিকে, সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাংবাদিকতার নামে অপকর্ম চালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনি প্রকৃত সাংবাদিকদের হয়রানি ও তাঁদের স্বাধীন সংবাদচর্চার পথে কোনো ধরনের কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করাও সমানভাবে বন্ধ করতে হবে।

একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন—কয়েকজন লোভী ও অসাধু ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধের দায় কোনোভাবেই পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর বর্তায় না। হাজার হাজার সংবাদকর্মী নিজেদের জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে সত্য প্রকাশ করছেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে কলম ধরছেন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের সেই ত্যাগ, সম্মান ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করা সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। তাই বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতার নামে পরিচয় বাণিজ্য, ব্ল্যাকমেইলিং এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দৃঢ় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় এসেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার সর্বজনীন নৈতিকতা, পেশাগত মানদণ্ড ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

পরিশেষে এটিই বলতে হয় যে, একটি ফেসবুক পেজ বা আইডি যে কাউকে সংবাদ প্রকাশের প্রযুক্তিগত সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু সততা, আদর্শ, দায়িত্ববোধ ও পেশাগত নৈতিকতা ছাড়া কাউকে প্রকৃত সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। সাংবাদিকতার পরিচয় সবসময়ই অত্যন্ত সম্মানের ও গৌরবের, এটি কোনোভাবেই অবৈধ উপায়ে চাঁদাবাজির ঢাল হতে পারে না। আসুন, সকল ধরনের অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে তীব্রভাবে সোচ্চার হই, প্রকৃত ও সৎ সাংবাদিকতার উজ্জ্বল মর্যাদা রক্ষা করি এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করি। এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকি ছবি।

আরো পড়ুন

ভারতের সঙ্গে জামায়াতের লিয়াঁজো শুরু হয়েছে-ঝিনাইদহে রাশেদ খান

লং মার্চ সফল করার লক্ষ্যে ঝিনাইদহে জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন

কালীগঞ্জে ৪০ বস্তা ভেজাল সার উদ্ধার পিকআপসহ দুজন আটক

কোটচাঁদপুরে মাছ ব্যবসায়ীকে বেঁধে মারধর ও টাকা ছিনতাই

কালীগঞ্জে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত

কালীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুদকের হানা : ঘুষের টাকাসহ আটক ১

কোটচাঁদপুর হাসপাতালে রোগীর ভোগান্তি কমিয়ে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান এমপি মতিয়ার রহমানের

১৩ বছর পর ঝিনাইদহের সুলতান হত্যা মামলার প্রধান আসামি সিআইডির জালে

তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে কোটচাঁদপুরে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *