ঝিকরগাছাসহ যশোর অঞ্চলে লাভজনক হওয়ায় তুলাচাষে ঝুঁকছেন কৃষকেরা

ঝিকরগাছাসহ যশোর অঞ্চলে লাভজনক হওয়ায় তুলাচাষে ঝুঁকছেন কৃষকেরা

ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধি 

তারিখ: ৪ নভেম্বর ২০২৬

দেশের বস্ত্রশিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল আঁশতুলা উৎপাদনে আবারো আশার আলো দেখাচ্ছে যশোর অঞ্চল। অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী কৃষি আবাদের তুলনায় আঁশতুলা অধিক লাভজনক হওয়ায় এটি আবাদে ঝোঁক বাড়াচ্ছেন এতদাঞ্চলের কৃষকেরা। সরকারি প্রত্যক্ষ সহায়তা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সরাসরি বিক্রয় সুবিধার ফলে যশোরের মাঠের পর মাঠে এখন শোভা পাচ্ছে সবুজের সমারোহ।

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বস্ত্রখাতের বিশাল চাহিদা মেটাতে এবং সিংহভাগ আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরকার বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে আঁশতুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ লাখ বেল। এই লক্ষ্য অর্জনে পর্যায়ক্রমে তুলার জমির পরিমাণ বাড়িয়ে ২ লাখ হেক্টরে উন্নীত করে ২০৩০ সালে ৫ লাখ বেল, ২০৪০ সালে ১০ লাখ বেল ও ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল উৎপাদনের ছক কষা হয়েছে। বর্তমানে বছরে দেশে মোট চাহিদার ১৬ লাখ বেল তুলার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন থেকে কেবল ১৮ থেকে ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জাতীয় বাজেটে সাশ্রয় হবে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম জানান, বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলার ১৩২টি উপজেলায় উফশী ও পাহাড়ি জাতের তুলা চাষ হচ্ছে, যার ৬৯ শতাংশ জমিতে উফশী এবং ৩১ শতাংশ জমিতে পাহাড়ি জাত আবাদ হচ্ছে। প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার বেল তুলা উৎপাদিত হচ্ছে।

যশোরের ঝিকরগাছা, চৌগাছা, শার্শা, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলায় চলতি উৎপাদন মৌসুমে তুলা আবাদে ব্যাপক ফলনের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ক্ষেতে ফুল ও ফলের প্রাচুর্য দেখে চাষিদের চোখে-মুখে ভেসে উঠছে আনন্দের রেখা।

যশোরের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান জানান, এ বছর ব্যাপকভিত্তিক তুলা চাষের জমির আওতা বাড়ানো হয়েছে। ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসাড়া ইউনিয়নের রঘুনাথ নগর ও বর্ণি ব্লকের আওতায় প্রায় ৩০০ বিঘা এবং যশোর এয়ারপোর্ট রোডে ২০০ বিঘা জমিতে তুলার আবাদ করা হয়েছে। এছাড়াও আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সাথে তুলা চাষ প্রসারে আলোচনা চলছে, যাতে আগামী বছর আরও কয়েকশ একর জমিতে তুলা আবাদ সম্প্রসারিত করা সম্ভব হয়। তিনি আরও জানান, ঝিকরগাছা উপজেলার কৃষকেরা দীর্ঘকাল তুলা চাষে অভ্যস্ত হওয়ায় এই এলাকাকে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। কৃষকদের তুলা চাষে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা বৃদ্ধির বিষয়টিও প্রশাসনের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।

বাংলাদেশ কটন জিনার্স অ্যাসোসিয়েশন যশোর জোনের প্রতিনিধি মো. তারেক রেজা পলাশ আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে এবার যশোর অঞ্চলের তুলাচাষিরা আর্থিকভাবে প্রচুর লাভবান হবেন।

ঝিকরগাছা ইউনিট-০১ এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. অহিদুজ্জামান জানান, তাঁর ব্লকে ৩২০ জন চাষি সরকারি প্রণোদনার তালিকাভুক্ত রয়েছেন। প্রতি বিঘার জন্য কৃষকদের ৬০০ গ্রাম উন্নত বীজ, ২৫ কেজি ইউরিয়া, ৫০ কেজি টিএসপি এবং ৫০ কেজি পটাশ সার সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় এই সাহায্য পর্যাপ্ত নয় বলে তিনি জানান এবং প্রণোদনা বৃদ্ধির দাবিকে যৌক্তিক হিসেবে আখ্যা দেন।

অঞ্চলটির তুলা চাষের ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৮০ সালের ২০ নভেম্বর যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুরে “কটন রিসার্চ সেন্টার অ্যান্ড সিড ফার্ম” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই যশোর অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে তুলা চাষের যাত্রা শুরু হয়। শুরুর দিকে কৃষিতে এটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলেও পরবর্তীতে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ক্রয় কেন্দ্রের বকেয়া আটকে থাকাসহ নানাবিধ দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে সম্ভাবনাময় এই খাতটি মুখ থুবড়ে পড়েছিল।

তবে বর্তমানে বাজারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সরাসরি সরকারি ও সুবিধাজনক স্থানে তুলা ক্রয়ের ব্যবস্থা চালু হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়েছে। এতে পরিবহন খরচ, সময় এবং ভোগান্তি কমায় চাষিদের মধ্যে স্বস্তি ও আস্থা ফিরে এসেছে। এছাড়া বেসরকারি পর্যায় থেকেও আধুনিক প্রযুক্তি ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ মেলায় কৃষকদের দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের ঝিকরগাছা ইউনিট-০১ এ ৩২০টি, ইউনিট-০২ এ ৩৭০টি, শার্শার উলাশী ইউনিটে ৩০০টি, চৌগাছায় ৩৮০টি, হাকিমপুরে ১৫০টি, যশোর সদরে ২৩০টি, মনিরামপুরে ১০০টি, ঝাপায় ২৫০টি, পুড়োপাড়ায় ৫০টি, রাজগঞ্জে ৫০টি, কেশবপুরে ২৫০টি, বারোবাজারে ৩৫০টি, খাজুরায় ১৫০টি এবং কালিগঞ্জে ৫০টিসহ সর্বমোট ৩ হাজারটি প্রণোদনা প্যাকেজ বণ্টন করা হয়েছে।

স্থানীয় তুলাচাষিদের মতে, প্রতি বিঘা জমিতে তুলা উৎপাদনে খরচ হয় আনুমানিক ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বিঘাপ্রতি গড় ফলন পাওয়া যায় ১৩ থেকে ১৫ মণ। বিগত বছরে প্রতিমণ তুলা বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ৮শ থেকে ৩ হাজার ৯শ টাকায়। সে হিসেবে সব খরচ বাদে প্রতি বিঘায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা লাভ থাকে। তবে চলতি মৌসুমে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কিছুটা বেশি হওয়ায় চূড়ান্ত বিক্রয়কালে কাঙ্ক্ষিত ও ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় তুলাচাষিরা।

ছবি সংগৃহীত।

আরো পড়ুন

বকুলতলায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় যশোর কোতোয়ালি থানায় মামলা

তরিকুল ইসলামের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকীতে চাঁচড়া ও উপশহর ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কামালের উপস্থিতিতে দোয়া ম...

বেনাপোল ইমিগ্রেশনে বাগেরহাটের যুবলীগ নেতা হিমাংশু পাল আটক

যশোরে রক্ষীবাহিনীর হামলায় নিহত বামপন্থী নেতাদের আত্মত্যাগ স্মরণ : শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের আহ্বান

যশোর উপশহর পেশাজীবী ফোরামের উদ্যোগে তরিকুল ইসলামের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

"যশোরের উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দিশারী তরিকুল ইসলাম": আল-হেরা কলেজ অডিটোরিয়ামে স্মরণ সভায় নেতৃ...

যশোর-খুলনা মহাসড়কে ২৪ ঘণ্টায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজনের প্রাণহানি

কেশবপুর প্রেসক্লাব নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি ডবলু ও সম্পাদক বুলবুল

"যশোর গড়ার কারিগর তরিকুল ইসলাম চিরস্মরণীয়": কেশবপুর দলীয় কার্যালয়ে স্মরণ সভায় নেতৃবন্দ

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *