বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়াঃ
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা সংলগ্ন পশ্চিম খাজুরা এলাকায় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং স্থায়ী ভবন নির্মাণের দাবিতে বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ১০টার দিকে লেবুর বনসংলগ্ন সমুদ্রসৈকত এলাকার পশ্চিম খাজুরায় স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে শত শত নারী-পুরুষের পাশাপাশি ওই প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। উপকূলীয় অঞ্চলের দরিদ্র জেলে পরিবারের সন্তানরা যাতে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী স্থানীয় সচেতন মানুষ ও অভিভাবকরা জানান, পর্যটননগরী কুয়াকাটার অদূরে অবস্থিত পশ্চিম খাজুরা এলাকার বাসিন্দাদের সিংহভাগের জীবিকা নির্বাহ হয় সমুদ্রনির্ভর কার্যক্রমে। এখানকার দরিদ্র জেলে পরিবারের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার একমাত্র প্রধান ভরসা হলো পশ্চিম খাজুরা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে অত্র অঞ্চলে আলো ছড়িয়ে যাওয়া এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করছে। অথচ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের মুখ দেখেনি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ও একটি স্থায়ী ভবনের চরম সংকট রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বর্তমান আর্থিক সংকট ও অবকাঠামোগত কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে যদি বিদ্যালয়টির নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তবে এই জনপদের দরিদ্র পরিবারগুলোর অসংখ্য শিশুর শিক্ষাজীবন ঘোর অন্ধকারে ও অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হবে। তাদের ভাষ্যমতে, বিদ্যালয়টি থেকে অন্তত চার কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় স্থানীয় কোমলমতি শিশুদের জন্য এখানে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ অত্যন্ত অপরিহার্য।
বিজ্ঞাপন
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, দুর্গম উপকূলীয় পরিবেশ, চরম দারিদ্র্য এবং জীবিকা নির্বাহের নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যেও বিদ্যালয়টি এলাকার শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো সফলভাবে ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি পাঠদান কেন্দ্র নয়, বরং উপকূলের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। তাই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং ঝরে পড়ার হার রোধ করতে বিদ্যালয়টি অবিলম্বে জাতীয়করণ এবং একটি টেকসই স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোসা. রেবেকা সুলতানা তার বক্তব্যে বলেন, “প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নিজেদের সীমিত সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করে আমরা কষ্টেসৃষ্টে বিদ্যালয়টি চালিয়ে আসছি। কিন্তু এ ধরনের বাস্তবতায় এভাবে আর কত দিন টিকে থাকা সম্ভব, তা আমার জানা নেই। শিক্ষকতা পেশাকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করাও এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও অবুঝ শিশুগুলোর মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে বিদ্যালয়টি সচল রেখেছি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা যদি আর্থিক সংকটের নির্মম বাস্তবতায় এ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হই, তবে এই এলাকার শত শত শিশুর শিক্ষাজীবন চিরতরে হুমকির মুখে পড়বে। অনেক শিশু হয়তো মাঝপথেই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা চিরতরে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। আমরা কোনোভাবেই চাই না যে, চরম দারিদ্র্যের অভিশাপে কোনো শিশুর সোনালী স্বপ্ন মাঝপথে থেমে যাক।” উপকূলের অবহেলিত শিশুদের মৌলিক শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আকুল আবেদন জানান।
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাহিদা বেগম গণমাধ্যমকে জানান, ২০১৩ সালে সারা দেশের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে পর্যায়ক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে সরকারিভাবে জাতীয়করণ করা হয়েছিল। ফলে ওই তিন ধাপের কোনোটির মধ্যেই যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আওতায় আসেনি, সেগুলোকে বর্তমানে নতুন করে জাতীয়করণ করার কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে বিদ্যালয়টির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা জানান, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক ও দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার পথ সুগম রাখতে সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুকম্পা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণ এবং আধুনিক স্থায়ী ভবন নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ, স্থায়ী ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। ছবি প্রতিবেদক।

