স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত এক পলাতক আসামিকে গ্রেফতারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় থানা পুলিশের এক সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) বিরুদ্ধে অর্থ দাবি, মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া ও মারধরের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। তবে আমাদের অনুসন্ধানী টিম ও পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে এই অভিযোগের সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র এবং নেপথ্য রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় পরোয়ানা তামিল করায় এবং আসামিপক্ষের অনৈতিক ও অবৈধ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ সাজানো হয়েছে।
অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, গত ২৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় পরোয়ানাভুক্ত আসামি রেজাউল করিমকে গ্রেফতারে মাঠে নামে পুলিশ। এর ধারাবাহিকতায় ২৪ অক্টোবর শেষ রাতে (রাত সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে) ঝিকরগাছা পৌরসভার কৃষ্ণনগর এলাকায় আসামির নিজ বাড়িতে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। যদিও সে সময় অভিযুক্ত আসামিকে ঘরে পাওয়া যায়নি, তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামির আপন ছোট ভাই আসাদুজ্জামান পুলিশ দলকে অনৈতিক উপায়ে বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করার এবং আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে প্রস্তাব দেন। কিন্তু কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা সেই অবৈধ প্রস্তাব দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন।
পরবর্তীতে নিজস্ব সোর্স ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৪ অক্টোবর সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে ঝিকরগাছা থানার নারাঙ্গালী বাজারের একটি চায়ের দোকান থেকে তিন মামলার চার্জশিটভুক্ত ও পরোয়ানাভুক্ত শীর্ষ আসামি রেজাউল করিমকে হাতেনাতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
বিজ্ঞাপন
আমাদের অনুসন্ধানী টিমের কাছে পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই আশরাফুল আলম এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে জানান, ‘গ্রেফতারের সময় এবং পরবর্তীতে থানায় আসার পর আসামি রেজাউল ও তাঁর ভাই আসাদুজ্জামান নানা উপায়ে পুলিশকে ম্যানেজ করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। আমাদের দলের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনৈতিক বা বেআইনি প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় তাঁরা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার বিরুদ্ধে কাল্পনিক টাকা দাবি, মোবাইল ও মোটরসাইকেলের চাবি কেড়ে নেওয়া এবং থাপ্পড় মারার মিথ্যা গল্প তৈরি করে অভিযোগ দাখিল করেছেন।’
এএসআই আশরাফুল আরও স্পষ্ট করে জানান, আসামির ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল ও চাবি কোনো অবস্থাতেই আত্মসাৎ করা হয়নি। আইনি নিয়ম মেনেই ঝিকরগাছা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর- ১১১৯, তারিখ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬) মূলে সেগুলো জব্দ ও নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে। এমনকি জব্দকৃত মালামাল আসামির পরিবারের কোনো দায়িত্বশীল সদস্যের নিকট বুঝিয়ে দিতে চাইলে তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে বাধ্য হয়েই আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তা জিডিভুক্ত করা হয়।
এদিকে আমাদের অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশি রেকর্ডপত্র ও অপরাধী তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ধৃত আসামি রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক গুরুতর ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ১. সিআর মামলা নম্বর ২৭০/২৬ (তারিখ: ১৯ আগস্ট ২০২৬), ধারা ৪২০/৪০৬/৫০৬(২) দণ্ডবিধি। ২. চৌগাছা থানার মামলা নম্বর ১০/১৩৯ (তারিখ: ৭ জুন ২০২২)। ৩. ঝিকরগাছা থানার মামলা নম্বর ১৯/২১ (তারিখ: ১৮ মে ২০১৯), ধারা ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩৫৪/৪২৭/৩৮০/৫০৬/১১৪ দণ্ডবিধি।
শুধু তাই নয়, যে ভাই আসাদুজ্জামান পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, তাঁর নিজের বিরুদ্ধেও ঝিকরগাছা থানায় একটি নিয়মিত মামলা (মামলা নম্বর- ১৯/২১, তারিখ: ১৮ মে ২০১৯) বিদ্যমান রয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, দাগী আসামি ও পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতারের পর আইনানুগ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভেঙে দিতে এ ধরনের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তোলার প্রবণতা নতুন নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত ও সঠিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে এবং আইনের শাসন সমুন্নত থাকবে বলেই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। ছবি সংগৃহীত।
