স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
তারিখ: ৫ নভেম্বর ২০২৬
স্ত্রী ও দেড় বছর বয়সী কন্যাসন্তান থাকার পরও নিজের বৈবাহিক তথ্য গোপন করে এবং অবিবাহিত সেজে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে চালক পদে চাকরি নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যশোরের এক যুবকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ওই যুবকের নাম রুবেল হোসেন। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে স্থানীয় এলাকা জুড়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগের সুনির্দিষ্ট শর্ত ভঙ্গ করে তিনি কীভাবে এই চাকরি পেলেন, তা নিয়ে এখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযুক্ত রুবেল হোসেন যশোর সদর উপজেলার রূপদিয়া সংলগ্ন কামারগন্যা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম আব্দুল্লাহ। বর্তমানে তিনি নারায়ণগঞ্জের পূর্বাঞ্চল ফায়ার সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। তাঁর ব্যাচ নম্বর ঢাকা-১৭।
বিজ্ঞাপন
অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবার এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রুবেল বিগত ২০২৫ সালে পারিবারিকভাবে জুঁই নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে জান্নাতি নামের দেড় বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। তাঁর শ্বশুরের নাম মারজান। ফায়ার সার্ভিসে চাকরি পাওয়ার আগে রুবেল যশোর শহরের সিটি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেন বলে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর গত ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ড্রাইভার বা চালক পদে শূন্য পদে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। ওই বিজ্ঞপ্তির ‘চ’ নম্বর শর্তে প্রার্থীকে অবশ্যই অবিবাহিত থাকার কড়া বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, রুবেল হোসেন নির্ধারিত ওই শর্ত পূরণ না করেই ক্ষমতার অপব্যবহার বা তথ্য গোপনের মাধ্যমে চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন। তিনি চাকরিতে আবেদনের সময় বৈবাহিক তথ্য জালিয়াতি বা গোপন করেছিলেন কি না, তা নিয়ে এখনই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কামারগন্য গ্রামের সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য সাহাবার হোসেন এই বিষয়ে জানান, তিনি রুবেলকে ভালোভাবে চেনেন। তাঁর বাবার নাম আব্দুল্লাহ এবং তিনি যে বিবাহিত, সে বিষয়ে তাঁর পরিষ্কার ধারণা রয়েছে।
একই এলাকার নারী ইউপি সদস্য শিখা বেগম বলেন, “আমি রুবেলকে চিনি। তিনি বিবাহিত এবং তাঁর একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। কিছুদিন আগে আমি তাঁকে এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে চারিত্রিক ও নাগরিক সনদ দিয়েছি।” তবে অবিবাহিত উল্লেখ করে তাঁকে কোনো প্রত্যয়নপত্র বা সনদ দিয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এমন কোনো বৈবাহিক সনদ তিনি দেননি এবং তাঁর স্মরণেও নেই।
অনুসন্ধানের সময় রুবেলের চাচা শ্বশুর লিটন, যিনি কামারগন্য মোড়ে একটি চায়ের দোকান পরিচালনা করেন, তিনিও রুবেলকে নিজের ভাইয়ের জামাই বলে গণমাধ্যমের কাছে পরিচয় দেন। এছাড়া স্থানীয় অপর এক চা দোকানি সোহাগও রুবেলের বিবাহিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে রুবেলের নিজস্ব পারিবারিক পরিমণ্ডলে। অভিযুক্তের বাবা আব্দুল্লাহর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছেলের বিয়ের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন। একই সাথে রুবেলের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
এদিকে চাঞ্চল্যকর এই অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য অভিযুক্ত রুবেল হোসেনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। ফোন রিসিভ করে অপর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি নিজেকে রুবেলের ছোট ভাই বলে পরিচয় দেন এবং জানান যে ফোনটি বর্তমানে তাঁর কাছে রয়েছে। পরবর্তীতে রুবেলের নিজের সাথে কথা বলার জন্য তাঁর নাম্বার চাইলে ওই ব্যক্তি কোনো উত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। যে কারণে এ বিষয়ে অভিযুক্ত রুবেল হোসেনের সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, এই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে ফায়ার সার্ভিস ও অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছন, “নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীকে অবশ্যই অবিবাহিত হতে হবে। কারও ক্ষেত্রে যদি এর কোনো ব্যত্যয় ঘটে এবং সুনির্দিষ্ট কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ দেন, তাহলে বিষয়টি তদন্তপূর্বক বিধি মোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে রুবেলের নিয়োগের সময়ের দাখিলকৃত তথ্যাদি যাচাই করা হোক এবং যদি তথ্য গোপনের প্রমাণ মেলে তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ছবি সংগৃহীত।

