মোঃ মাসুদ রানা, (কালীগঞ্জ) ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ড্রাগন ফলের বাগানে সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত সারি সারি বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখছেন কৃষকেরা। মৌসুমের বাইরে ফলন পাওয়ার আশায় আধুনিক এ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন অনেক চাষি। তবে একই সময়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং ও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে ড্রাগন বাগানে রাতভর বিপুলসংখ্যক বাতি জ্বালানোর সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর কোনো অতিরিক্ত চাপ পড়ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলার চাচড়া, বালিয়াডাঙ্গা, শিবনগরসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠে সন্ধ্যা নামলেই চোখে পড়ে ড্রাগন বাগানের ভিন্ন এক দৃশ্য। গাছের সারির মাঝে স্থাপন করা শত শত এলইডি বাতি একসঙ্গে জ্বলে ওঠে। কৃষকদের ভাষ্য, রাতভর কৃত্রিম আলো ব্যবহারের মাধ্যমে ড্রাগন গাছে ফুল আসার সময় নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে শীত মৌসুমেও ফলন পাওয়া সম্ভব হয়। এ সময় বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় আগেভাগেই অনেকে বাগানে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা শুরু করেছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় চারশত ৪৭ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। এ কাজে যুক্ত রয়েছেন এক হাজার সাতশত ৯১ জন কৃষক। তাঁদের মধ্যে দুইশত ৫১ জন কৃষক অধিক ফলনের আশায় বাগানে বৈদ্যুতিক আলো ব্যবহার করছেন।
বিজ্ঞাপন
চাচড়া গ্রামের ড্রাগনচাষি খলিলুর রহমান বলেন, ড্রাগন গরমকালের ফল হলেও কৃত্রিম আলো ব্যবহারের পদ্ধতি ব্যবহার করলে শীত মৌসুমেও ফলন পাওয়া যায় এবং তখন বাজারদরও ভালো থাকে। এ কারণে অনেক কৃষক শীতের আগেই বাগানে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার শুরু করেছেন এবং তিনিও নিজের এক বিঘা জমিতে এ ব্যবস্থা করেছেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, যেসব এলাকায় ড্রাগন বাগানে রাতভর বাতি জ্বলছে, সেসব এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটও হচ্ছে ঘন ঘন। পৌর এলাকার শিবনগর গ্রামের বাসিন্দা রহমত আলী জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে শিশু, বয়স্ক ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। অথচ পাশের মাঠে রাতভর অনেক ড্রাগন বাগানে বাতি জ্বলতে দেখা যায়। তিনি মনে করেন, ড্রাগন বাগানে বৈদ্যুতিক আলো ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতা, এর বৈধতা এবং স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রকৃত প্রভাব কতটা—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে ড্রাগন বাগানের বাতি জ্বালানোর সঙ্গে স্থানীয় লোডশেডিংয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রযুক্তিগত পর্যালোচনার কথা জানাননি।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আখতারুজ্জামান মিয়া জানান, ড্রাগনচাষিদের কৃত্রিম আলো ব্যবহারের পদ্ধতিতে চাষের বিষয়ে কৃষি অফিস থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। যাঁরা এ পদ্ধতিতে চাষ করছেন, তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্তেই করছেন।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কালীগঞ্জ উপজেলার আবাসিক প্রকৌশলী জয়দ্বীপ সরকার জানান, সরকারিভাবে বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহারের তালিকায় কৃষি খাতের বিষয়টি উল্লেখ নেই। তবে ড্রাগন বাগানে রাতভর বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানোর বিষয়ে কোনো অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ জানান, ড্রাগন বাগানে রাতভর বাতি জ্বালানোর কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো ঘাটতি বা অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে কি না, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, ড্রাগন বাগানে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সংযোগগুলো বৈধ কি না, কোথাও অবৈধ সংযোগ বা বিদ্যুতের অপব্যবহার হচ্ছে কি না এবং রাতভর বিপুলসংখ্যক বাতি ব্যবহারে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় বাস্তবে কোনো অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে কি না—তা সরেজমিনে পরিদর্শন ও কারিগরি যাচাই করা হোক। একদিকে কৃষকের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের বিদ্যুৎ পাওয়ার ভোগান্তি—দুই বিষয়কে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। ছবি প্রতিবেদক।
