স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ, ১ মাস ১৪ দিন আটকে রেখে পা ভেঙে অমানুষিক নির্যাতন এবং সেই দৃশ্য ভিডিও কলে দেশে থাকা পরিবারকে দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ আদায়কারী আন্তর্জাতিক মানব পাচার ও অপহরণ চক্রের ২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন— মামলার ১ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪) এবং ৭ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি মর্জিনা বেগম (৩৯)।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার বিজয়নগর গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী ইদ্রিস আলী (৫৪) লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির আনজারা নামক স্থানে বসবাস করতেন। গত ১৭ মার্চ ২০২৫ তারিখে স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় উত্তম সরকার, আসলাম, আরিফ মোল্লা ও রাজু মিয়াসহ একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতকারী ৩টি গাড়িতে এসে অস্ত্রের মুখে তাকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তার চোখ বেঁধে একটি ঘরে আটকে রেখে তার পাসপোর্ট, মোবাইল ও মূল্যবান কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
ঘটনার দুদিন পর ১৯ মার্চ অপহরণকারীরা ইদ্রিস আলীকে বেধড়ক মারধর করে এবং ইমো ভিডিও কলে সোনারগাঁওয়ে অবস্থানরত তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে নির্যাতনের বিভৎস দৃশ্য দেখায়। পরবর্তীতে আসামিরা বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ও বিকাশ নম্বর প্রদান করে তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে দফায় দফায় ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করে।
টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলাকালীন অপহৃত ইদ্রিস আলীকে প্রতিদিন একটি মাত্র রুটি ও এক বোতল পানি দিয়ে অনাহারে রাখা হতো। লোহার রডের নির্মম আঘাতে তার ডান পা ভেঙে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মোট ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাওয়ার পর গত ৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে অপহরণকারীরা ইদ্রিস আলীকে ত্রিপোলির মদিনা নামক স্থানে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায়। চিকিৎসা শেষে লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত ২২ জুলাই ২০২৫ তারিখে দেশে ফিরে ভিকটিম ইদ্রিস আলী বাদী হয়ে সোনারগাঁও থানায় মামলা (মামলা নং- ৪১, তারিখ: ১৫/০৯/২০২৬) দায়ের করেন।
মামলাটি পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা স্ব-উদ্যোগে গ্রহণ করার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) মফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে পিবিআইয়ের একটি চৌকস দল তথ্য-প্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ড এলাকা থেকে আসামি উত্তম সরকার ও মর্জিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে।
আদালতের নির্দেশে আসামিদের ৩ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সংঘবদ্ধ চক্রটি লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ বাংলাদেশি প্রবাসীদের টার্গেট করে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করত এবং বাংলাদেশে অবস্থিত স্বজনদের কাছ থেকে নামে-বেনামে ব্যাংকিং ও বিকাশ চ্যানেলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিত।
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ৩ দিনের রিমান্ড শেষে আসামিদের আদালতে প্রেরণ করা হলে আসামি মর্জিনা বেগম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় বিজ্ঞ আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। পিবিআই জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক এই অপহরণ চক্রের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তারে আভিযানিক কার্যক্রম ও মামলার সার্বিক তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।ছবি সংগৃহীত।