বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া,
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের দুই পাশে অনুমোদনহীনভাবে অর্ধশতাধিক বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ডের ফ্রেম স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে একদিকে যেমন সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং বিচ এলাকা সাইনবোর্ডে ঢেকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, অন্যদিকে বাঁধ সুরক্ষায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ জিওটিউব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পৌরসভার এমন অপরিকল্পিত ও অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থানীয় মহলে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে যে, পৌর এলাকায় নাগরিক সেবামূলক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন কিংবা মশক নিধন কার্যক্রমের মতো জরুরি বিষয়গুলোতে নজর না দিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ একশ্রেণির বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ড স্থাপনে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এমনকি সৈকতের প্রধান প্রবেশপথ চৌরাস্তাও বিভিন্ন বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ডে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, সমুদ্র সৈকতের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা, সৌন্দর্যবর্ধন এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পরিবর্তে এ ধরনের অযাচিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে? বিশেষ করে বাঁধ রক্ষায় ব্যবহৃত জিওটিউব কেটে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে এসব স্ট্রাকচার স্থাপন করায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে রোববার (১ নভেম্বর ২০২৬) সকালে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কুয়াকাটা চৌরাস্তার পশ্চিম পাশে সৈকত রক্ষা বাঁধের প্রায় হাফ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এসব বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ডের বড় বড় কাঠামো বা ফ্রেম বসানো হয়েছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তায় স্থাপিত এসব সাইনবোর্ডে এলইডি লাইটযুক্ত বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি কুয়াকাটার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ছবি প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে দাবি করা হলেও পুরো বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুয়াকাটা পৌর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগেই মূলত বেড়িবাঁধের দুই পাশে এই অর্ধশতাধিক সাইনবোর্ডের ফ্রেম স্থাপন করা হয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব জমিতে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের জন্য যথাযথ ও আইনগত কোনো অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে। বাঁধের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত জিওটিউব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয়রা এখন বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি অনুভব করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুয়াকাটা পৌরসভার প্রকৌশলী মো. খায়রুল ইসলাম জানান, এটি একটি কোম্পানির সাইনবোর্ড এবং এর মাধ্যমে কুয়াকাটার দর্শনীয় স্থানগুলোর ছবিও তুলে ধরা হবে। তবে দাপ্তরিক অনুমতির বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কিছু না বলে পৌর প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে, পৌর প্রশাসক ও কলাপাড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক দাবি করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়েছে এবং জমিতে সাইনবোর্ড স্থাপনে তাদের কোনো আপত্তি নেই। এটি মূলত পৌরসভার জমি নয়, বরং পাউবোর জমি এবং পাউবোর এসডিই ইমরানকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। বিজ্ঞাপন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটি পৌরসভাকে বার্ষিক একটি নির্দিষ্ট ফি প্রদান করবে—এমন চুক্তির ভিত্তিতেই সাইনবোর্ডগুলো বসানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাহানারা করপোরেশন নামক একটি প্রতিষ্ঠান এতে স্পন্সর করেছে এবং এখান থেকে অর্জিত আয় পৌরসভার রাজস্ব খাতে জমা হয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হবে বলে জানান তিনি।
তবে পৌর প্রশাসকের দাবির সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট অমিল ও অনৈক্য লক্ষ্য করা গেছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (কলাপাড়া সার্কেল) শাহ আলম সম্পূর্ণ বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, এ বিষয়ে তিনি বিন্দুমাত্র অবগত নন এবং কে বা কারা এই স্থাপনাগুলো তৈরি করেছে তা তাঁর জানা নেই। তাঁর মতে, পাউবোর লিখিত অনুমতি ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা তৈরি করা আইনগতভাবে কোনোভাবেই সম্ভব নয়; তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
একই সুরে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুজ্জামান বলেন, বিষয়টি খোঁজ নেওয়া হবে। এটি যদি সরকারি সম্পত্তি বা বিধিবহির্ভূত কিছু হয়ে থাকে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহানেওয়াজ তালুকদার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, পাউবোর জমিতে দাপ্তরিক অনুমতি ছাড়া কোনো কিছু করা অসম্ভব। তাদের নিজস্ব জমিতে যদি এ ধরনের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়ে থাকে, তবে তা দ্রুত উচ্ছেদ করা হবে।
পৌর প্রশাসকের একতরফা দাবি এবং পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীর সম্পূর্ণ অজ্ঞতার বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে আদৌ কোনো লিখিত অনুমোদন বা বৈধ চুক্তি দেওয়া হয়েছিল কি না, দেওয়া হয়ে থাকলে তার শর্ত কী ছিল এবং জিওটিউব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর চূড়ান্ত অবস্থান কী—তা অবিলম্বে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের আইনি বৈধতা, বিজ্ঞাপন থেকে সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ের স্বচ্ছতা এবং উপকূলীয় বেড়িবাঁধের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। ছবি প্রতিবেদক।
