স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানা এলাকায় দীর্ঘ দুই বছর ধরে নিখোঁজ থাকার সাজানো নাটকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক লোমহর্ষক, বর্বরোচিত ও রোমহর্ষক জোড়া হত্যাকাণ্ড এবং লাশ গুমের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। কোটি টাকা মূল্যের পৈত্রিক সম্পত্তি সম্পূর্ণ নিজেদের কব্জায় নিতে সৎ মা ও আপন সৎ শিশুপুত্র ভাইকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পুকুরপাড়ে মাটিচাপা দিয়ে রাখার দুই বছর পর ঘটনার মূল হোতাসহ ৩ ঘাতককে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি নোয়াখালী ইউনিট। আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ভেকু (এস্কেভেটর) দিয়ে মাটি খুঁড়ে ও পুকুর সেচে নিহত মা ও ছেলের কঙ্কালসার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। গত ২১ মে রাতে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানা এলাকা থেকে শুরু হওয়া সিআইডির এক ঝটিকা আভিযানিক অ্যাকশনে এই অভাবনীয় সাফল্য আসে। সিআইডির এই অভাবনীয় ও নিখুঁত তদন্তের জেরে দীর্ঘদিনের ক্লু-লেস জোড়া খুনের জট খোলায় দেশজুড়ে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন ও স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
সিআইডির দাপ্তরিক ও আভিযানিক নথির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ অনুযায়ী, ২০১২ সালের দিকে জীবনের নানা দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে বিধবা কমলা খাতুন (তখন বয়স ২২) নতুন করে সংসার পাতেন সোনাইমুড়ীর বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের সংসারে ৫ ছেলে থাকলেও, দ্বিতীয় সংসারে কমলা খাতুনের কোল আলো করে জন্ম নেয় ফুটফুটে পুত্রসন্তান নোমান। প্রায় ৭-৮ বছর আগে আবুল কালাম আজাদ মারা যাওয়ার আগে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন ও অবুঝ শিশু নোমানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বসতবাড়িসহ সংলগ্ন প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দিয়ে যান, বর্তমান বাজারমূল্যে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। এই বিশাল সম্পত্তিকে কেন্দ্র করেই প্রথম পক্ষের সৎ ছেলেদের সাথে কমলা খাতুনের দীর্ঘকাল ধরে তীব্র বিরোধ ও চরম পারিপার্শ্বিক শত্রুতা চলে আসছিল। বিশেষ করে বিদেশ থেকে ফেরত আসা সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে দিতে কমলা খাতুনের ওপর অনবরত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাত।
বিজ্ঞাপন
এরই জেরে গত ২০২৪ সালের ১০ মার্চ ভিকটিমের সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণ করতে সোনাইমুড়ী থানায় একটি সাজানো নিখোঁজ ডায়েরি (জিডি) করেন, যেখানে দাবি করা হয় ৯ মার্চ থেকে তাঁর সৎ মা নিখোঁজ। তবে কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগমের মনে গভীর সন্দেহ দানা বাঁধলে তিনি ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি সুনির্দিষ্ট পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালত প্রথমে ডিবি ও পরে মামলাটির ভার সিআইডি নোয়াখালী ইউনিটকে হস্তান্তর করেন। সিআইডি দীর্ঘ তিন মাস নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে ২০২৪ সালের ৪ জুন এটিকে একটি নিয়মিত অপহরণ ও হত্যা মামলায় রূপান্তর করে তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের একপর্যায়ে সিআইডির চৌকস দল ভিকটিম কমলা খাতুনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে উদ্ধার করে। সেই সূত্র ধরে সিআইডি জানতে পারে, ঘটনার পর কমলা খাতুনের সৎ ছেলে সাইফুল ইসলাম রাজন ওরফে রাজু ঢাকায় ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন এবং তড়িঘড়ি করে ফোনটি বিক্রি করে পালিয়ে যান। দীর্ঘ দুই বছরের নিরলস অনুসন্ধান শেষে তথ্যপ্রযুক্তির অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে গত ২১ মে (২০২৬) গভীর রাতে সিআইডি নোয়াখালীর একটি বিশেষ আভিযানিক দল এলআইসি সিআইডির সহায়তায় ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানাধীন ভাটিকাশর এলাকায় ঝটিকা ব্লক রেইড দিয়ে মূল ঘাতক সাইফুল ইসলাম রাজন ওরফে রাজু (৪০)-কে লোহার খাঁচায় পোরে। রাজুর দেওয়া বিস্ফোরক তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন ২২ মে সন্ধ্যায় নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে অপর মূল হোতা জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর (৪৫) এবং তাদের সহযোগী আশিকুর রহমান টিপু (৩২)-কে অবরুদ্ধ করা হয়।
পরবর্তীতে আদালতের অনুমতিতে এনে এই ৩ জল্লাদকে নিবিড় ও কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হলে তারা মা ও শিশুকে খুনের সেই হাড়হিম করা লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়। তারা স্বীকার করে যে, সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে ঘটনার ১৫ দিন আগেই তারা হত্যার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে এবং বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগে থেকেই একটি গভীর গর্ত খুঁড়ে রাখে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের রাতের খাবারের পানির সাথে উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে মা ও ছেলে অচেতন হয়ে পড়লে ঘাতকরা ঘরে প্রবেশ করে গামছা পেঁচিয়ে, হাত দিয়ে গলা চেপে এবং বালিশ চাপা দিয়ে অত্যন্ত পৈশাচিক কায়দায় শ্বাসরোধ করে মা ও শিশুপুত্রকে হত্যা করে। অপরাধের আলামত সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে তারা ভিকটিমদের পরিধেয় কাপড় খুলে নেয় এবং পূর্বপ্রস্তুত জায়গায় লাশ দুটি পুঁতে রাখে। পরে ব্যবহৃত গামছা ও জামাকাপড় আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
ধৃত আসামিদের দেওয়া গাইড তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৪ মে (২০২৬) সকালে সিআইডির একটি ভারী টিম স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও বিপুল সংখ্যক এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে নির্দেশিত পুকুর সেচে ও এস্কেভেটরের (ভেকু) সাহায্যে খনন কার্য চালিয়ে ভিকটিম কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের কঙ্কাল ও দেহাবশেষ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। উদ্ধারকৃত দেহাবশেষের সুরতহাল প্রস্তুতপূর্বক ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করে নোয়াখালী সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।
সিআইডি নোয়াখালী ইউনিটের পক্ষ থেকে সোমবার ২৫ মে ঘটনার আইনি অগ্রগতির বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, গ্রেপ্তারকৃত ৩ হাইপ্রোফাইল আসামীকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে তারা বিজ্ঞ বিচারকের সামনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের অপরাধনামা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। বিজ্ঞ বিচারক তাদের জামিন কঠোরভাবে নামঞ্জুর করে সরাসরি জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এই বর্বরোচিত জোড়া হত্যাকাণ্ডের সাথে পর্দার আড়ালে জড়িত থাকা অন্য কোনো ইন্ধনদাতা বা কুচক্রী মহল রয়েছে কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে এবং অপরাধের পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট আদালতে দাখিল করতে সিআইডির কঠোর তদন্ত ও আভিযানিক কার্যক্রম জিরো টলারেন্স ভিত্তিতে বলবৎ থাকবে বলে সিআইডি সদর দপ্তর থেকে দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছে। ছবি সংগৃহীত।


