রফিক মন্ডল, নিজস্ব প্রতিবেদক,কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) :
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় ২০২৬ সালের এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার ফলাফলে সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে এক চরম বৈপরীত্য ও বড় ফারাক পরিলক্ষিত হয়েছে। উপজেলার ছয়টি সাধারণ কলেজে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার যেখানে নেমে এসেছে মাত্র ৪১ দশমিক ৮৫ শতাংশে, সেখানে চারটি মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৮২ দশমিক ৭১ শতাংশ। দুই ধারার মোট ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবার ১ হাজার ২০১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫৫৭ জন শিক্ষার্থী এবং সর্বমোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৮ জন।
প্রাপ্ত আনুষ্ঠানিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যশোর বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় উপজেলার ছয়টি কলেজে মোট ১ হাজার ৬৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছেন মাত্র ৪৪৭ জন এবং জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন ২৩ জন। অন্যদিকে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় চারটি মাদ্রাসা থেকে ১৩৩ জন অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১১০ জন শিক্ষার্থী এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৫ জন।
এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে কলেজগুলোর পারফরম্যান্সে ব্যাপক হতাশা তৈরি হয়েছে। ছয়টি কলেজের মধ্যে পাসের হারের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে প্রগতি মডেল কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানের ৪৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২৭ জন, যার পাসের হার ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। উপজেলার প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি কে. এম. এইচ. কলেজ থেকে ৬২৫ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২৯৭ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৪৭ দশমিক ৫২ শতাংশ হলেও সর্বোচ্চ ১৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন এই কলেজ থেকেই।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া মোহাম্মদ আলী মডেল কলেজে ১৫ জনের মধ্যে ৭ জন পাস করে ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, কোটচাঁদপুর পৌর মহিলা কলেজে ১৪৫ জনের মধ্যে ৫৪ জন পাস করে ৩৭ দশমিক ২৪ শতাংশ (জিপিএ-৫ চারজন) এবং সাফদারপুর-দোড়া মহাবিদ্যালয়ে ১৯৭ জনের মধ্যে ৫৮ জন পাস করে ২৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ (জিপিএ-৫ একজন) সফলতা অর্জন করেছে। আর সবচেয়ে শোচনীয় ফলাফল করেছে জি. টি. কলেজ, তালসার। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৩৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছেন মাত্র ৪ জন, যার পাসের হার ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং সেখান থেকে কেউ জিপিএ-৫ পাননি।
বিপরীত চিত্রে আলিম পরীক্ষায় দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়েছে উপজেলার মাদ্রাসাগুলো। চারটির মধ্যে পাসের হারে শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছে হাজী আলতাফ হোসেন হরিন্দিয়া আলিম মাদ্রাসা, যেখান থেকে ৮ জন পরীক্ষার্থীর সবাই কৃতকার্য হয়েছেন। কোটচাঁদপুর কামিল মাদ্রাসায় ৭৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬৭ জন, যার পাসের হার ৯১ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ চারজন জিপিএ-৫ লাভ করেছেন। এছাড়া সাফদারপুর দারুল উলুম আলিম মাদ্রাসায় ২৬ জনের মধ্যে ১৮ জন পাস করে ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ (জিপিএ-৫ একজন) এবং দয়ারামপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসায় ২৬ জনের মধ্যে ১৭ জন পাস করে ৬৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ সফলতা পেয়েছে।
ফলাফলের এই বড় ধরনের তারতম্য ও বৈষম্য দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহল। বিশেষ করে জি. টি. কলেজ ও সাফদারপুর-দোড়া মহাবিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান ও পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। মাদ্রাসাগুলোর সামগ্রিক পারফরম্যান্স তুলনামূলক ইতিবাচক হলেও সব প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত মান ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। সার্বিকভাবে সাধারণ কলেজগুলোর এই বড় ধস কাটিয়ে তুলতে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা এবং উপজেলা শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকর তদারকি ও অভিভাবকদের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফাইল ছবি সংগৃহীত।
