স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
একুশ শতকে দাঁড়িয়েও কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের নামে চরম নারীনির্যাতনের এক লোমহর্ষক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে নাটোরের গুরুদাসপুরে। তথাকথিত ‘কালো জাদু’ ও ‘কুফরি কালাম’ করার অবৈজ্ঞানিক ও অসত্য অভিযোগে একটি পরিবারের তিন নারীকে প্রকাশ্য দিবালোকে জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ঘুরিয়ে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী যুবদল নেতা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে।
গতকাল সোমবার (৫ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে গুরুদাসপুর পৌরসভার গাড়িষাপাড়া এলাকায় মানবতাকে বিসর্জন দেওয়ার এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। রাতেই নির্যাতনের দুটি খণ্ডচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমলোচনার ঝড় ওঠে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া ভিডিওর দৃশ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই মধ্যবয়সী নারী ও এক তরুণীর গলায় জুতার মালা ঝুলিয়ে গ্রামের পাকা রাস্তা দিয়ে জোরপূর্বক হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাঁদের পেছনে একদল উৎসুক জনতা করতাল ও হইচই করে সেই অবমাননাকর ঘটনা উপভোগ করছে। অন্য একটি দৃশ্যচিত্রে দেখা যায়, যুবদল সদস্য জিয়াউর রহমান জিয়ার বাসভবনের একটি আবদ্ধ কক্ষে ওই তিন নারীকে আটকে রেখে ছাবলু নামের এক ব্যক্তি ভয়ভীতি দেখিয়ে সাদা (ফাঁকা) স্ট্যাম্পে সই নিচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন জিয়া নিজেই।
বিজ্ঞাপন
ভুক্তভোগীদের আহাজারি ও পরিবার সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, জিয়াউর রহমান জিয়া ও তাঁর ভাই ইয়ারুল ইসলামের পরিবারের এক তরুণীর হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কবিরাজ ও ঝাড়ফুঁককারীদের কাছে যান ইয়ারুল। কবিরাজদের অন্ধকথার ওপর ভিত্তি করে তাঁরা প্রতিবেশী ওই তিন নারীর বিরুদ্ধে ‘বান মারা’ ও ‘কালো জাদু’ করার অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন অপবাদ চাপিয়ে দেন।
পরবর্তীতে সোমবার দুপুরে ইয়ারুল সরদার ও তাঁর সঙ্গীরা জোরপূর্বক তাঁদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে এক কক্ষে অবরুদ্ধ করেন। সেখানে শারীরিক নির্যাতন ও মারধরের পর ফাঁকা স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তীতে সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও হেয় করার উদ্দেশ্যে তাঁদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে পুরো গ্রাম ঘোরানো হয়। ভুক্তভোগী নারীরা এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কঠোর বিচার প্রার্থনা করেছেন।
অবশ্য অভিযোগের বিষয়ে যুবদল নেতা জিয়াউর রহমান জিয়া নিজ সম্পৃক্ততা এড়িয়ে দাবি করেন, তিনি বাইক দুর্ঘটনায় হাত ভেঙে দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দি ও শয্যাশায়ী। অপরদিকে ইয়ারুল সরদার তিন নারীকে অপমানের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট জবাব না দিলেও দাবি করেন, তাঁর মেয়ের বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর থেকে শারীরিক অসুস্থতার পেছনে কবিরাজ ও মাওলানারা ‘কালো জাদু’র অস্তিত্ব পান। এরপর বিক্ষুব্ধ মহল্লাবাসী নাকি ক্ষিপ্ত হয়ে ওই নারীদের ধরে এনে এই সাজা দিয়েছে। উপরন্তু তিনি ভুক্তভোগীদের নামেই থানায় উল্টো লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আবদুল হান্নান জানান, তিন নারীকে অপমান ও জুতার মালা পরানোর বিষয়ে এখনও থানায় কেউ কোনো লিখিত আবেদন জমা দেননি। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ঘটনার তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ছবি সংগৃহীত।

