মোঃ মাসুদ রানা, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
তারিখ: ৪ নভেম্বর ২০২৬
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল ইউনিয়নের উল্লা গ্রামে এক অদ্ভুত ও হৃদয়বিদারক বাস্তবতা বিরাজ করছে। একই গ্রামের চারজন মানুষ শারীরিক সীমাবদ্ধতা, দারিদ্র্য আর চরম প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। কারও স্বপ্ন স্বাভাবিকভাবে কথা বলা ও পড়ালেখায় ফেরা, কারও প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা ও একটি হুইলচেয়ার, আবার কারও সংগ্রাম ছোট্ট শিশুকন্যাকে নিয়ে জরাজীর্ণ ঘরে মাথা গোঁজার। সরকারের তরফ থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে তা দিয়ে চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে চরম অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটছে এই চার পরিবারের।
সম্প্রতি উল্লা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে এই চার প্রতিবন্ধীর জীবনসংগ্রামের মর্মস্পর্শী চিত্র উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
শুনতে চায়, স্কুলে ফিরতে চায় আট বছরের আবু রায়হান : উল্লা গ্রামের দিনমজুর আসাদুল ইসলাম ও সিমা খাতুন দম্পতির বড় সন্তান আবু রায়হান। আট বছর বয়সী এই শিশুটি শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী। জন্ম থেকেই সে স্বাভাবিকভাবে শুনতে ও কথা বলতে পারে না। দিনমজুর বাবার পক্ষে ধারদেনা করে উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। ৩০ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা দামের ‘হিয়ারিং মেশিন’ (কানে শোনার যন্ত্র) কিনতে না পারায় তার দুনিয়াটা আজও নীরব। বিদ্যালয়ে গেলে সহপাঠীদের উপহাসে অপমানিত হয়ে সে এখন আর স্কুলেই যেতে চায় না। মা সিমা খাতুন আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, “একটি হিয়ারিং মেশিন পেলে আমার ছেলেটা শুনতে পারত, পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হতে পারত।”
চিকিৎসা ও হুইলচেয়ারের অপেক্ষায় সাথী খাতুন : আবু রায়হানদের বাড়ির পাশেই থাকেন ২৭ বছর বয়সী সাথী খাতুন। কৃষক ফরাদ উল্লাহ ও রেবেকা খাতুন দম্পতির বড় মেয়ে সাথী। পরিবারের ভাষ্যমতে, দুই মাস বয়সে একটি টিকা নেওয়ার পর থেকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বর্তমানে তাঁর কোমরের নিচের অংশ সম্পূর্ণ অচল। নিজে হাঁটাচলা করতে পারেন না, কথা বলতেও সমস্যা হয়। মেয়ের চিকিৎসার জন্য বাপ-দাদা ভিটে জমি বিক্রি করে আজ নিঃস্ব। তিন মাস অন্তর পাওয়া ভাতার টাকায় কোনোমতে ওষুধ চলে। একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার পেলে তাঁর জীবনযাত্রা কিছুটা সহজ হতো বলে জানান তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা।
মায়ের মৃত্যুর পর আরও অসহায় আলী রাজ : সাথীর বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে বসবাসকারী ২১ বছর বয়সী আলী রাজ দুই হাতে লাঠি ভর দিয়ে কষ্ট করে পথ চলেন। তারিক হোসেন ও মরহুমা আন্না খাতুন দম্পতির বড় ছেলে আলী রাজ অর্থাভাব ও উপহাসের কারণে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মা মারা যান। স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাবা তারিক হোসেন ভিটেমাটি ছাড়া সব হারিয়ে আজ দিশাহারা। আলী রাজের জন্য একটি হুইলচেয়ার ও চিকিৎসার আকুতি জানিয়েছেন তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীরা।
ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে সাক্ষীর সংগ্রাম : আলী রাজদের ঠিক পাশেই থাকেন ৪০ বছর বয়সী সাক্ষী খাতুন। জন্ম থেকেই তাঁর দুটি পা নেই। দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে তাঁকে চলাচল করতে হয়। দরিদ্র কৃষক নুর ইসলাম ও লিলি খাতুন দম্পতির ৭ সন্তানের বড় সাক্ষী ভালোবেসে কোলা ইউনিয়নের আকির হোসেনের অন্যত্র বিয়ে করায় স্বামী তাঁকে ৪ বছরের কন্যাসন্তানসহ ত্যাগ করেন। এরপর থেকে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জরাজীর্ণ ঘরে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। নিজের চলাফেরা ও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।
সমাজসেবা কর্মকর্তার আশ্বাস : উল্লা গ্রামের এই চার অসহায় মানুষের কষ্টের কথা শুনে কালীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, “জামাল ইউনিয়নের উল্লা গ্রামের এই চারজনেরই প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র ও ভাতা রয়েছে। আবু রায়হানের হিয়ারিং মেশিন এবং অন্য তিনজনের হুইলচেয়ার ও চিকিৎসার প্রয়োজনের বিষয়ে পরিবারগুলো আবেদন করলে সরকারি নিয়ম ও বরাদ্দ অনুযায়ী তাঁদের দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।”
দারিদ্র্য আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকা উল্লা গ্রামের এই চার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে দেশের বিত্তবান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সহানুভূতিশীল মানুষের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। সামান্য সহযোগিতা বা একটি হুইলচেয়ার হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে তাঁদের জীবনের নতুন কোনো আলো। ছবি সংগৃহীত।

