কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি :
তারিখ: ৭ নভেম্বর ২০২৬
ঐতিহাসিক স্মরণ, রাজপথে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং জাতীয় ঐক্যের দৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। দিনটিকে কেন্দ্র করে পুরো উপজেলা শহরজুড়ে এক আমোদপ্রমোদ ও উদ্দীপনামূলক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য র্যালি, পতাকা উত্তোলন এবং দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনের মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়।
আজ শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬) সকালে কোটচাঁদপুর উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেন ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. মতিয়ার রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীম হুসাইন।
বিজ্ঞাপন
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি মতিয়ার রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও পথনির্ধারক একটি দিন। ওইদিন সাধারণ সিপাহি ও মুক্তিকামী জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের ফলেই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার সব ধরনের গভীর ষড়যন্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল। ৭ নভেম্বর মূলত দেশ ও জাতির শত্রু-মিত্রকে পরিষ্কারভাবে চেনার এক ঐতিহাসিক উপলক্ষ ছিল।
অতীতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের পাতা নিয়ে সবসময় পড়ে থাকা যেমন বোকামি, তেমনি অতীতকে বেমালুম ভুলে যাওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং সুদূরপ্রসারী ইতিহাস থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে আগামীর পথ নির্মাণ করতে হবে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই, আর ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম। ঠিক তেমনিভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অনন্য এক স্থান দখল করে আছে।
দেশ গঠনে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে এমপি মতিয়ার রহমান উল্লেখ করেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অটুট রাখা, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং একটি স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে আর কেউ যেন সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করতে না পারে এবং দেশকে কোনো শক্তির ওপর পরনির্ভরশীল করে তুলতে না পারে, সে বিষয়ে সকলকে সদা সতর্ক থাকতে হবে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।’ ৭ নভেম্বরের অন্তর্নিহিত বৈপ্লবিক চেতনাকে বুকে ধারণ করে প্রকৃত দেশপ্রেম, অটুট গণতন্ত্র এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গৃহীত সকল কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করেন।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন কোটচাঁদপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী, পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র এস কে এম সালাহউদ্দিন বুলবুল সিডল, সাধারণ সম্পাদক এম এ কাশেম, কোটচাঁদপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মেহেদি হাসান, সিনিয়র বিএনপি নেতা মো. আবুবকর বিশ্বাস, উপজেলা জামায়াতের আমির মো. আজিজুর রহমান, থানা সেক্রেটারি শাহাবুদ্দিন খান, পৌর আমির মুহাদ্দিস আব্দুল কাইয়ুম এবং সাবেক সেক্রেটারি সহকারী অধ্যাপক মুহা. শরিফুল ইসলাম প্রমুখ।
অন্যদিকে, দিবসটি ঘিরে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। এর আগে এলাঙ্গী ইউনিয়ন বিএনপির প্রস্তুতি সভায় স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান সিদ্দিকী, যুবদলের আহ্বায়ক আশরাফুজ্জামান খান মুকুল এবং স্থানীয় অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীগণ বিভিন্ন কর্মসূচি সফল করতে নানামুখী প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
আলোচনা সভা শুরুর পূর্বে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের যৌথ নেতৃত্বে একটি বিশাল ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। র্যালিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড হাতে অংশ নেন।
দিবসের আগের দিন থেকেই কোটচাঁদপুর শহরকে সাজানো হয় ভিন্ন সাজে। বিভিন্ন সড়কে সাদা পতাকা ও সবুজ-রঙিন সাজসজ্জায় তৈরি হয় উৎসবের আবহ। এছাড়া উপজেলা ও পৌর বিএনপির উদ্যোগে পৌর শহরের মেইন বাজার চত্বরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ সময় পরিবেশন করা হয় জাতীয় সংগীত ও দলীয় সংগীত। শহরের বিভিন্ন মোড়ে মাইকে প্রচারিত দেশাত্মবোধক গান পুরো এলাকায় এক আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শীলা বেগমের সুচারু সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন আব্দুর রহমান এবং পবিত্র গীতা পাঠ করেন সুবাস কুমার রায়। পরিশেষে জাতীয় জীবনে ঐক্য, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। ছবি সংগৃহীত।
