বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া
কলাপাড়ায় আলোচিত ১০ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু রাইয়ানকে হত্যার আগে সারারাত জেগে ইয়াবা সেবন করেছিলেন তার আপন খালু আল-আমিন। আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও মরদেহ গুমের চাঞ্চল্যকর বিবরণ দিয়েছেন তিনি।
আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, শিশু রাইয়ানকে হত্যার আগে সারারাত জেগে ইয়াবা সেবন করেছিলেন এবং ভোরে আজানের সময় ঘর থেকে বের হয়ে শ্যালিকা রুমানার বাড়িতে যান আল-আমিন। পেছন দিক থেকে উঁকি দিয়ে শ্যালিকা রুমানাকে ঘরের পিঁড়ি লেপার কাজ করতে দেখেন তিনি। এ সময় ১০ মাসের শিশু রাইয়ান তার বাবার কাছে বিছানায় ঘুমিয়ে ছিল। সুযোগ বুঝে আল-আমিন এক হাতে শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে অন্য হাতে তার মুখ চেপে ধরে দ্রুত নিজের বাড়ির দিকে চলে যান।
এরপর বাড়ির সামনে গ্রামের হেলালের একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে গেলে শিশুটিকে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। নড়াচড়া না করায় রাইয়ান মারা গেছে বলে ধারণা করেন আল-আমিন। কাউকে আশপাশে দেখতে না পেয়ে কোমর থেকে কাপড়ের কালো ব্যাগ বের করে শিশুটির মরদেহ উল্টো করে ঢুকিয়ে ব্যাগের মুখ বেঁধে ফেলেন এবং হেলালের ঘরের টিনের চালার ওপর রেখে দেন। পরে হেলালের পুকুরে নেমে গামছা দিয়ে নিজেকে ভিজিয়ে মাছ ধরে ফেরার ভান করেন ।এরপর মরদেহভর্তি ব্যাগটি নিয়ে নিজের বাড়ির পেছনে গিয়ে সুযোগ বুঝে একটি খালে ফেলে দেন। ব্যাগটি পানিতে না ডুবে ভাসায় আবারও খালে নেমে কচুরিপানার মধ্যে তা লুকিয়ে রাখেন। সেখান থেকে উঠে হাত-পা ধুয়ে বাড়িতে গিয়ে পান খেয়ে ধূমপান করেন তিনি।পরবর্তীতে অন্যদের মতো তিনিও রাইয়ান নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে খোঁজাখুঁজিতে অংশ নেন এবং শ্যালিকা রুমানাকে পুকুরে খুঁজতে বলেন।
বিজ্ঞাপন
জবানবন্দিতে আল-আমিন দাবি করেন, তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম পাঁচ বছর ধরে বিদেশে থাকায় পারিবারিক বিরোধ মেটাতে শ্যালিকা রুমানার কাছে গেলে তিনি উল্টো জুতা দিয়ে মারতে উদ্যত হন এবং দুইবার আঘাত করেন। এছাড়া ভবিষ্যতে ফের সেখানে গেলে জুতা দিয়ে মারার হুমকিও দেওয়া হয়। এই ক্ষোভ থেকেই শ্যালিকার ক্ষতি করার চেষ্টা করেন এবং শিশুটিকে হত্যা করে খালে ফেলে দেন বলে স্বীকার করেন তিনি। চার দিনের পুলিশি রিমান্ড শেষে ২১ অক্টোবর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাপাড়া থানার উপপরিদর্শক মো. ফোরকান মিয়া জানান, আদালতের নির্দেশে ১৮ অক্টোবর প্রধান আসামি আল-আমিনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং চার দিন পর তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন।
এদিকে শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তার মা রুমানা বেগম যথাযথ বিচার দাবি করেছেন। তার অভিযোগ, রাইয়ানের ঘাড় মটকে এবং হাত-পা ভেঙে হত্যার পর কাপড়ের বাজারের ব্যাগে ভরে কচুরিপানার নিচে খালে ফেলে দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের দিন সকালে নিজের বাড়িতে বেলা ১১টা পর্যন্ত নিখোঁজ রাইয়ানকে খোঁজার ভান করেন আল-আমিন। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আল-আমিনের সহযোগী ও কথিত গডফাদারদের হুমকির কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন রুমানা। তার অপর দুই সন্তান এবং স্বামী রাসেল খানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তিনি।
রুমানা আরও জানান, ১৫ অক্টোবর পুলিশ আল-আমিনকে আটক করার রাতে তার কথিত গডফাদারখ্যাত এক ব্যক্তি ক্যাডারদের নিয়ে তাদের বাড়ির সামনে গিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেন। আল-আমিনকে ছাড়িয়ে না আনলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকিও দেওয়া হয়। রুমানার দাবি, তার বোনের স্বামী হলেও আল-আমিন একজন পেশাদার চোর, মাদকসেবী ও মাদককারবারি। ৫ আগস্টের পর বিএনপির পরিচয়ে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
উল্লেখ্য, নিখোঁজের ৫৩ ঘণ্টা পর ১৭ অক্টোবর বাড়ির পাশের খাল থেকে ১০ মাসের শিশু রাইয়ানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়রা দুর্গন্ধ পেয়ে কচুরিপানার মধ্যে একটি ব্যাগ দেখতে পেয়ে থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে। কলাপাড়া থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুত মূল আসামিকে আটক করেছে এবং আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং ওই পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। ফাইল ছবি সংগৃহীত।

