জাকির হোসাইন তুষার, মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের মধুমতি নদীর বুকে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো প্রথম বাৎসরিক “মহম্মদপুর মধুমতি নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা”। নদীর দুই পাড়ে লাখো মানুষের সমাগম, সুদৃশ্য নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, ঢাকঢোলের বাদ্য এবং বাইচালদের সম্মিলিত ‘হেইওরে, হেইওরে’ ধ্বনিতে পুরো এলাকা এক দারুণ রূপ ধারণ করেছিল। এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে কেন্দ্র করে মাগুরা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জসহ কয়েকটি জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষের আগমন ঘটে, যা মহম্মদপুর ব্রিজ ঘাট ও এর আশপাশের এলাকাকে এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত করে।
আজ রোববার (১ নভেম্বর ২০২৬) বিকেলে মধুমতি নদীর তীরে এই জমজমাট নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। মইমুর আলী মৃধার সভাপতিত্বে এই বর্ণাঢ্য উৎসবটি পরিচালিত হয়। আরো উপস্থিত ছিলেন মাগুরা জেলার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ, মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রি ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাৎসরিক মেলার আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজক ও স্থানীয় লোকজনের পরিকল্পনা রয়েছে যে, প্রতিবছর নির্দিষ্ট এই দিনে এই নৌকা বাইচ ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন করা হবে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি ও আনন্দের প্রধান প্রতীকে পরিণত হবে।
বিজ্ঞাপন
আজ রবিবার দুপুর গড়াতেই নৌকাবাইচ উপভোগ করতে দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ মধুমতি নদীর দুই তীরে জড়ো হতে শুরু করেন। শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ এবং বয়োবৃদ্ধদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে নদীর পাড়গুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। প্রতিযোগিতায় মোট ১২টি সুসজ্জিত নৌকা অংশগ্রহণ করে। টানটান উত্তেজনাকর এই প্রতিযোগিতায় প্রতিটি দল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে লড়তে থাকে এবং দর্শকরাও প্রিয় দলকে মুহুর্মুহু স্লোগানে উৎসাহিত করেন।
নৌকাবাইচের এই আনন্দ আয়োজনের পাশাপাশি নদীর তীর ঘেঁষে বসেছিল একটি বিশাল গ্রামীণ মেলা। মেলাপ্রাঙ্গণে মাছ-মাংস, হরেক রকমের মিষ্টি, চানাচুরসহ ঐতিহ্যবাহী নানা খাবারের দোকান, গ্রামীণ কুটিরশিল্পের পণ্য, শিশুদের মাটির তৈরি হরেক রকমের খেলনা, নারীদের প্রসাধনী সামগ্রী এবং আনন্দ বিনোদনের জন্য নাগরদোলাসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় রাইডের ব্যবস্থা ছিল। বাহারি তোরণ ও আলোকসজ্জায় সাজানো মেলাপ্রাঙ্গণে দর্শনার্থীরা কেনাকাটা ও আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই মেলা কেন্দ্র করে বেচাকেনা বেশ ভালো হওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে দারুণ লাভবান হয়েছেন এবং এলাকার সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী নৌকাবাইচের বিভিন্ন ইভেন্ট উপভোগ করেন এবং প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী প্রতিযোগীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।
এ সময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বাঙালির হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এই ধরনের মেলা এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধনকে আরও বেশি সুদৃঢ় করবে। বর্তমান সরকার দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি-কালচারকে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলো নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমেই কেবল দেশের সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা সম্ভব এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা যাবে।
মধুমতি নদীর শান্ত বুকে বর্ণিল নৌকাবাইচ, দুই পাড়ে জনস্রোতের উল্লাস এবং গ্রামীণ মেলার প্রাণবন্ত আবহে দিনটি মহম্মদপুরবাসীর জন্য একটি স্মরণীয় উৎসবে পরিণত হয়। শতবর্ষের এই লোকজ ঐতিহ্য আগামী দিনগুলোতেও একইভাবে ধরে রাখার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও আয়োজক কমিটি। ছবি প্রতিবেদক।

