স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের অপরাধ জগতের অন্যতম চাদর ও ত্রাস, আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত গডফাদার এবং সীমান্ত রুটের অন্যতম মাদক সম্রাট অনিক হাসান অনি ও তার প্রধান সহযোগী তানভীর আহমেদকে বর্বরোচিত অস্ত্রের মজুদসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ। জেলা ডিবির একটি শক্তিশালী ও চৌকস আভিযানিক দল অত্যন্ত গোপন ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ঝটিকা ব্লক রেইড দিয়ে শংকরপুর এলাকার এই দুই শীর্ষ অপরাধীকে অবরুদ্ধ করতে সক্ষম হয়। গত সোমবার সন্ধ্যার পর যশোর শহরের শংকরপুর বাবলাতলা এলাকার একটি নির্জন মাছের ঘেরের ভেতরের টংঘরের সামনে এই রুদ্ধশ্বাস ও সফল সামরিক কায়দার অভিযানটি পরিচালিত হয়। অপরাধীদের তল্লাশি চালিয়ে তাদের হেফাজত থেকে একটি অত্যাধুনিক বিদেশী পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, পাঁচ রাউন্ড তাজা গুলি ও ধারালো চাকু উদ্ধার করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুরে যশোর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম এই চাঞ্চল্যকর ও গৌরবময় আভিযানিক সাফল্যের বিস্তারিত বিবরণ গণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।
বিজ্ঞাপন
ডিবি পুলিশের দাপ্তরিক ও মামলার বিবরণী অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত দুই হাইপ্রোফাইল আসামির মধ্যে মূল হোতা অনিক হাসান অনি (৩০) যশোর শহরের শংকরপুর এলাকার কুখ্যাত আলতাফ হোসেন আলতু ওরফে আলতুর পুত্র। অপর ধৃত আসামি তানভীর আহমেদ (২২) শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার তরিকুলের পুত্র। পুলিশ জানায়, ধৃত অনি যশোর শহরের শংকরপুর, চাঁচড়াসহ বিস্তীর্ণ কলোনী এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা এবং মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল, যার কারণে দীর্ঘকাল ধরে কলোনীবাসীরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনাতিপাত করছিলেন।
বিজ্ঞাপন
সফল এই বিশেষ ঝটিকা অভিযানের নেপথ্য কাহিনী তুলে ধরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম জানান, আসন্ন ঈদুল আজহা তথা কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে যশোরে সব ধরনের অস্ত্রধারী গ্যাং ও মাদক কারবারিদের দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জেলা গোয়েন্দা শাখার দক্ষ অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুজন কুমার মণ্ডলের প্রত্যক্ষ ও সুনিপুণ নেতৃত্বে ডিবির চৌকস সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) কামরুজ্জামান, এসআই কামাল হোসেন এবং এসআই বাবলা দাসসহ একদল সশস্ত্র ও ভারী ফোর্সের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ আভিযানিক টিম গত সোমবার রাতে বাবলাতলা এলাকায় ওত পাতে। ডিবির ডিটেকটিভ টিম নিশ্চিত হয় যে, মাছের ঘেরের ওই অন্ধকার টংঘরে বসে অনি ও তার বাহিনী কোনো বড় ধরনের ডাকাতি বা কলোনীতে প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে ডিবি জওয়ানরা চারদিক থেকে ঘেরটি অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং পালানোর চেষ্টাকালে দুই সন্ত্রাসীকে জাপটে ধরে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে।
পরবর্তীতে উপস্থিত স্থানীয় সাধারণ মানুষের সামনে কুখ্যাত সন্ত্রাসী অনিক হাসান অনির দেহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি চালানো হলে তার প্যান্টের কোমর থেকে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা একটি সচল বিদেশী পিস্তল, একটি ভারী ম্যাগাজিন এবং ০৫ রাউন্ড তাজা পয়েন্ট ৩০৩ ক্যালিবারের গুলি উদ্ধার ও জব্দ করা হয়। একই সাথে তার পাশে থাকা সহযোগী তানভীর আহমেদের প্যান্টের পকেট থেকে একটি ধারালো সুতীক্ষ্ণ চাকু উদ্ধার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের পক্ষ থেকে অনির ভয়ঙ্কর অপরাধের খতিয়ান তুলে ধরে জানানো হয়, অনিক হাসান অনি যশোরের একজন তালিকাভুক্ত ও মোস্ট ওয়ান্টেড শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানাসহ জেলার বিভিন্ন থানায় বর্বরোচিত খুন, একাধিক অস্ত্র মামলা, সীমান্ত গলিয়ে আনা মাদক ও দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজিসহ সর্বমোট ১৭টি গুরুতর ফৌজদারি মামলা দায়ের রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘ দিন পলাতক থাকায় বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক ৭টি সুনির্দিষ্ট মামলায় তার বিরুদ্ধে স্থায়ী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) ইস্যু করা ছিল। অপরদিকে তার সহযোগী তানভীর আহমেদের বিরুদ্ধেও কোতোয়ালি থানায় একটি চুরির সুনির্দিষ্ট মামলা চলমান রয়েছে।
জেলা ডিবি পুলিশ স্পষ্ট ভাষায় আশ্বস্ত করেছে যে, দুর্ধর্ষ অনি ও তানভীরকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গুলিসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তারের ঘটনায় এবং ১৮৭৮ সালের কঠোর অস্ত্র আইনের ধারা লঙ্ঘন করায় তাদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি নিয়মিত ও নতুন অস্ত্র মামলা দায়েরের দাপ্তরিক আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্তভাবে চলমান রয়েছে। সমস্ত আইনি ও দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ বিকেলের দিকেই আসামিদের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হবে। যশোর জেলাকে সম্পূর্ণ অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজমুক্ত করতে এবং এই ধরনের সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের মূল রুটগুলো চিরতরে উপড়ে ফেলতে জেলা পুলিশ ও ডিবির এই বিশেষ চিরুনি তল্লাশি ও আভিযানিক তত্পরতা আগামী দিনগুলোতেও কঠোরভাবে বলবৎ থাকবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। [ছবি সংগৃহীত]


