রফিক মন্ডল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার সলেমানপুর গ্রামের সাহাপাড়ায় এক অনবদ্য সামাজিক ও ধর্মীয় জাগরণ ঘটেছে। পুরুষদের উদাসীনতা ও নানা সীমাবদ্ধতায় শারদীয় দুর্গাপূজার নিয়মিত আয়োজন থমকে যাওয়ার উপক্রম হলে শক্ত হাতে পূজার সার্বিক হাল ধরেছেন এলাকার স্থানীয় নারীরা। পূজা আয়োজনের চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে প্রতিমা নির্বাচন, মণ্ডপ সাজানো, পূজার আনুষঙ্গিক কেনাকাটা এবং পুরোহিত ও ডেকোরেটর নির্ধারণ—সবই করছেন সাহাপাড়ার নারীরা। তাঁদের এই ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদ্যোগ সমগ্র জেলাজুড়ে সর্বস্তরের মানুষের কাছে ভূয়সী প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২৪ সালের আগে আর্থিক ও সাংগঠনিক নানা কারণে সাহাপাড়ায় দুর্গাপূজার আয়োজন ধরে রাখতে ব্যর্থ হন স্থানীয় পুরুষেরা। উৎসবটি বন্ধ হওয়ার মুখে পড়লে পাড়ার কয়েকজন সচেতন নারী একত্রিত হন। পরবর্তীতে গ্রামের অন্য নারীদের সাথে জরুরি বৈঠক করে তাঁরা গঠন করেন ‘নবারণ মহিলা সংঘ’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন। সেই থেকেই বিগত বছরগুলোতে সফলভাবে পূজার আয়োজন সম্পন্ন করে আসছেন এই নারী সংগঠনের সদস্যরা।
সরেজমিনে সলেমানপুর সাহাপাড়ার স্থানীয় মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, বেশ জোরকদমে চলছে দুর্গাপ্রতিমা ও পূজা মণ্ডপ সাজানোর কাজ। নারীরা নিজেদের গৃহস্থালির যাবতীয় নিত্যদিনের কাজকর্ম গুছিয়ে এসে কেউ প্রতিমায় রং দিচ্ছেন, কেউ মন্দিরের চত্বর ও দেওয়ালে নিখুঁত আল্পনা আঁকছেন, আবার কেউ ব্যস্ত সময় পার করছেন কেনাকাটা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অতিথি আপ্যায়নের তদারকিতে।
বিজ্ঞাপন
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক কবিতা রাণী সাহা জানান, পুরুষেরা যখন নানা সংকটে পূজার আয়োজন চালিয়ে যেতে পারছিলেন না, তখন তাঁরা নিজেরা বৈঠক করে হাল ধরার সিদ্ধান্ত নেন। এখন তাঁরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাঁদা তুলে সমস্ত কেনাকাটা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সারছেন। মহামায়া দেবী দুর্গার ভক্তিময় আরাধনা সফল করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
অন্যদিতে সংগঠনটির সভাপতি বেবী রাণী সাহা স্মৃতিচারণ করে বলেন, শুরুর দিকে নারীদের এই উদ্যোগ নিয়ে অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন ও তাঁদের নিরুৎসাহিত করতে চেয়েছিলেন। তবে পাড়ার মা-বোনদের আন্তরিকতা, ইস্পাতকঠিন সামাজিক ঐক্য ও দৃঢ় সহযোগিতায় তাঁরা সফলভাবে তিন বছর ধরে কাজটি চালিয়ে আসছেন। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাঁদের সাথে সার্বিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
সাহাপাড়ার নারীদের এমন চমৎকার সমন্বিত উদ্যোগ স্বচক্ষে দেখতে যশোর ও ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসুক দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাজার গোপালপুর এলাকা থেকে আসা সঞ্জয় কুমার সাহা মুগ্ধতা প্রকাশ করে জানান, পূজার কেনাকাটা থেকে শুরু করে কাঠামোগত যাবতীয় আয়োজন নারী সমাজ একাই পরিচালনা করছে। তাদের অসামান্য পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও অভূতপূর্ব সাংগঠনিক দক্ষতা যে কাউকে অনুপ্রাণিত করবে।
সাহাপাড়ার নারীদের এই ব্যতিক্রমী প্রয়াসের মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করেছেন ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন। তিনি উল্লেখ করেন, নারীরা দেশের বা সমাজের কোনো কাজেই পিছিয়ে নেই—কোটচাঁদপুরের এই দুর্গাপূজার আয়োজন তার বাস্তব প্রমাণ। ‘নবারণ মহিলা সংঘ’-এর এই শারদীয় আয়োজনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল ধরনের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন তিনি।
সলেমানপুর সাহাপাড়ার এই আয়োজন কেবল একটি ধর্মীয় বা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি গ্রামীণ নারী উন্নয়ন, নেতৃত্ব সৃষ্টি এবং নারী শক্তির আত্মবিশ্বাসের এক দৃষ্টান্তমূলক স্মারক। পরিচ্ছন্ন সদিচ্ছা ও দৃঢ় সংকল্প থাকলেযেকোনো কঠিন সামাজিক দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব, তা প্রমাণ করেছেন কোটচাঁদপুরের এই নারীরা। ছবি সংগৃহীত।
