স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
ঐতিহ্যবাহী যশোর শহরজুড়ে যানবাহন চলাচলে যেন কোনো নিয়মকানুনের বালাই নেই। সড়কজুড়ে বিরাজ করছে চরম বিশৃঙ্খলা, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ পথচারী ও চালকদের। দিনের পর দিন তীব্র যানজট, অবাধে অবৈধ যানবাহন চলাচল, চালকদের হয়রানি এবং অর্থ আদায়ের নামে দুর্ব্যবহার এখন শহরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী।
শহরের প্রাণকেন্দ্রসহ প্রতিটি ব্যস্ততম সড়কের প্রবেশমুখে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। ব্যাটারিচালিত রিকশা, অবৈধ ইজিবাইক এবং নসিমন-পরিমন পুরো শহর গিলে খেয়েছে। রাতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও তোয়াক্কা না করে নির্ধারিত সময়ের আগেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভারী যানবাহন। এসব অনিয়ম ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখের সামনে ঘটলেও তারা নিস্পৃহ ভূমিকা পালন করছেন।
ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যশোর ট্রাফিকে বর্তমানে ৮০ জনের বিশাল বহর রয়েছে। যার মধ্যে ইন্সপেক্টর ৫ জন, সার্জেন্ট ৭ জন, টিএসআই ৫ জন, এটিএসআই ১৪ জন এবং কনস্টেবল রয়েছেন ৪৯ জন। এত জনবল থাকা সত্ত্বেও যানজট নিরসনে দৃশ্যমান কোনো সাফল্য নেই। শহরের সেনট্রাল রোডের মোড়, জেনারেল হাসপাতালের সামনে, চিত্রা মোড়, মুজিব সড়ক, সিভিল কোর্ট মোড়, চৌরাস্তা এবং মনিহার ও পালবাড়ি এলাকায় অবৈধভাবে ব্যাটারিচালিত যান ও ইজিবাইক দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যশোর জেনারেল হাসপাতালের সামনের পরিস্থিতি। মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া যেখানে সময়ের লড়াই, সেখানে সড়কের ওপর ইজিবাইকের জটলায় অ্যাম্বুলেন্স ঢোকা তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে চলাই দায় হয়ে পড়েছে। কর্তব্যে নিয়োজিত সদস্যরা এই অরাজকতা দেখেও রহস্যজনক নীরবতা বজায় রাখছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে ট্রাফিক পুলিশ বেআইনি যানবাহনের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক বা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। মূলত চাকরি বাঁচানোর তাগিদে তারা নামে মাত্র দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, ট্রাফিক সার্জেন্টদের পুরো মনোযোগ থাকে মামলার বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে। শহর ও শহরের উপকণ্ঠে চেকপোস্ট বসিয়ে কাগজপত্র যাচাইয়ের দোহাই দিয়ে মোটরসাইকেল চালকদের অহেতুক হয়রানি করা হচ্ছে। হেলমেট বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সব ঠিক থাকার পরও সিগন্যাল অমান্য বা ওভারলোডিংয়ের মতো নানা ধারায় মামলা ঠুকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের মতে, আইন প্রয়োগের চেয়ে জরিমানা আদায়ই যেন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি দেখা গেছে জরিমানার অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়ায়। খুলনার পার্শ্ববর্তী জেলা নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর কিংবা কুষ্টিয়ায় যেখানে ট্রাফিক মামলার জরিমানা চালানের মাধ্যমে সরকারি ব্যাংকে জমা দিতে হয়, সেখানে যশোরে সরাসরি ট্রাফিক অফিসে নগদ টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। এর বিনিময়ে যানবাহন মালিক বা চালকদের কোনো বৈধ চালানের কপি বা রসিদ দেওয়া হয় না। ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের কক্ষে অর্থ জমা দিতে গিয়ে অনেকেই কর্মকর্তা ও বকশিদের চরম দুর্ব্যবহার ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন বলে একাধিক ভুক্তভোগী নিশ্চিত করেছেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মর্যাদার এক কর্মকর্তা জানান, নিয়ম অনুযায়ী জরিমানার অর্থ গ্রহণের পর জমাদানকারীকে সরকারি রসিদ প্রদান করা বাধ্যতামূলক। রসিদ না দেওয়া হলে সেখানে আর্থিক অনিয়ম বা আত্মসাতের সুযোগ থেকে যায়।
তবে যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান জানান, জরিমানার সব টাকা অনলাইনের মাধ্যমেই সংগ্রহ করা হয় এবং নিয়ম মেনে সংশ্লিষ্টদের রসিদ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আনীত সব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং এতে কোনো সত্যতা নেই বলে তিনি দাবি করেন।
যশোরের সামগ্রিক সড়ক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং ট্রাফিক বিভাগের এসব অনিয়ম ও চরম ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে যশোরের সুযোগ্য পুলিশ সুপারের সরাসরি ও আশু হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকেরা। ছবিটি চৌরাস্তা মোড় পুরাতন কোতয়ালী থানার সামনে থেকে তোলা।।
