স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
ইতালিতে উন্নত জীবন ও উচ্চ বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর এক প্রবাসী যুবককে মিসর হয়ে লিবিয়ায় পাচার, সেখানে অবরুদ্ধ করে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এবং পরবর্তীতে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে মানবপাচারকারী চক্রের দুই সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গতকাল সোমবার (৫ অক্টোবর ২০২৬) বিকেল ৫টার দিকে সিআইডির একটি বিশেষ আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর বিমানবন্দর থানাধীন আশকোনা হাজি ক্যাম্প সংলগ্ন সিভিল এভিয়েশন ওয়েলফেয়ার মার্কেটের সামনে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলেন—রংপুরের পীরগঞ্জ থানার বরিয়া গ্রামের মো. আব্দুল মতিনের ছেলে মো. আতিকুর রহমান টমাস (৩২) (বর্তমান ঠিকানা: গাওয়াইর, দক্ষিণখান, ঢাকা) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার কামালপুর গ্রামের মৃত সামছুল আলম ভূঁইয়ার ছেলে মো. বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলাল (৫৪) (বর্তমান ঠিকানা: বাসা নং-১৫৪, কলেজ রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা)।
বিজ্ঞাপন
মামলা ও সিআইডি সূত্র জানায়, ভুক্তভোগী যুবক নোয়াখালী জেলার সেনবাগ এলাকার বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘ তিন বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে দেশে ফেরার বিমানে এক সহযাত্রীর সঙ্গে তাঁর প্রাথমিক আলাপচারিতা হয়, যার সূত্র ধরে তিনি ওই আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। চক্রটির সদস্যরা তাঁকে অতি অল্প সময়ে ও নিরাপদে লিবিয়া রুট হয়ে ইতালিতে পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে ১২ লাখ টাকার চুক্তি করে।
চুক্তির বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ভুক্তভোগী ঢাকার আশকোনাস্থ পাচারকারীদের কার্যালয়ে নিজের পাসপোর্ট জমা দেন এবং নগদ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা অগ্রিম প্রদান করেন। এরপর ৭ এপ্রিল তাঁকে প্রথমে ভারতের নয়াদিল্লি ও পরে শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় ১৬ দিন আটকে রেখে বিভিন্ন কৃত্রিম সমস্যার অজুহাতে তাঁর স্বজনদের কাছ থেকে দফায় দফায় বিপুল অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। পরবর্তীতে তাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ হয়ে মিসরের কায়রোতে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগে প্রকাশ, কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর চক্রের স্থানীয় এজেন্ট তাঁকে একটি অপরিচিত আস্তানায় পাঁচ দিন অবরুদ্ধ করে রাখে। সেখানে চুক্তি মোতাবেক আরও ৬ হাজার মার্কিন ডলার দাবি করে জোরপূর্বক তা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে নগদ অর্থ, বিকাশ এবং বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ভুক্তভোগী ও তাঁর স্বজনদের কাছ থেকে মোট ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।
অর্থ আদায়ের পর ভুক্তভোগীকে গাড়িযোগে দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি সীমান্ত পথ পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে লিবিয়ায় ঢোকানো হয়। সেখানে পাচার চক্রের লিবিয়াস্থ প্রতিনিধি তাঁকে একটি নির্জন ‘গেম রুমে’ বন্দি রেখে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ভুক্তভোগীকে আটক করে কারাগারে পাঠায়। কারাবন্দি থাকা অবস্থায়ও চক্রটির সদস্যরা তাঁকে মুক্ত করে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে দেশের পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৬ লাখ টাকা দাবি করে।
পরবর্তীতে লিবীয় পুলিশের আইনি প্রক্রিয়া শেষে ১৬ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফিরে ভুক্তভোগী নিজে বাদী হয়ে রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট একাধিক ধারায় একটি মামলা (মামলা নং-২১, তারিখ: ০৫/১০/২০২৬) দায়ের করেন।
মামলাটির তদন্তভার পাওয়ার পরপরই সিআইডির সাইবার ও গোয়েন্দা টিম আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে। এরপর ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় প্রধান দুই আসামি মো. আতিকুর রহমান টমাস ও মো. বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলালকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই চক্রের পেছনে থাকা আন্তর্জাতিক অন্যান্য নেটওয়ার্ক ও সহযোগীদের চিহ্নিত করতে সিআইডির বিস্তৃত তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।
