জাকির হোসাইন তুষার, মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি:
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় মধুমতি নদীর বুকে অত্যন্ত উৎসবমুখর, আনন্দঘন ও প্রাণবন্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা ও লোকজ গ্রামীণ মেলা। নদীর দুই পাড়ে সমবেত লাখো মানুষের করতালি, উৎসবের ঢোল এবং বাইচালদের সমবেত ‘হেইওরে, হেইওরে’ হাঁকডাকে রূপ নেয় পুরো এলাকা। ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে আশপাশের কয়েক জেলার মানুষের এক মিলনমেলায় পরিণত হয় পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের ঝামা ঘাট এলাকা।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত মধুমতি নদীর ঝামা ঘাটে শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ও আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১২০ বছর ধরে প্রতিবছর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জনের ঠিক পরদিন ঝামা ঘাটে এই ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও মেলার আয়োজন করা হয়ে আসছে। বংশানুক্রমিক ও প্রজাতিগতভাবে চলে আসা এই পার্বণ এখন মহম্মদপুর তথা পুরো অঞ্চলের মানুষের সার্বজনীন উৎসব, পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও অসাম্প্রদায়িক বন্ধনের অনন্য প্রতীকে রূপ নিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার বেলা গড়ানোর সাথে সাথেই নদীর দুই কূলে ঢল নামতে শুরু করে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ এবং নানা শ্রেণিপেশার মানুষের। প্রিয় নৌকাকে সমর্থন ও উৎসাহিত করতে দর্শকদের হর্ষধ্বনি ও করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রবহমান মধুমতি নদী।
এবারের প্রতিযোগিতায় মোট সাতটি ঐতিহ্যবাহী কাঠের দ্রুতগামী নৌকা অংশ নেয়। তুমুল উত্তেজনাকর এবং হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে প্রথম স্থান অর্জন করে হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের আতিকের নৌকা। সমান তালে প্রতিযোগিতা চালিয়ে দ্বিতীয় স্থানে জায়গা করে নেয় একই গ্রামের লালটুর নৌকা এবং তৃতীয় স্থান লাভ করে বানা গ্রামের মমিনুর রহমানের নৌকা।
নৌকাবাইচের সমান্তরালে নদীর পাড়ে বসে সুবিশাল এক গ্রামীণ মেলা। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি-মন্ডা, মুখরোচক খাবার, মাটির খেলনা, লোকশিল্পজাত সামগ্রী, প্রসাধন সামগ্রী ও শিশু বিনোদনের নাগরদোলায় জমজমাট হয়ে ওঠে মেলাপ্রাঙ্গণ। মেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারিগরদের কেনাবেচা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় অঞ্চলটির স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক সঞ্চার ঘটে।
প্রতিযোগিতা শেষে অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, শত বছরেরও বেশি পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন শুধুই বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং এটি সমাজকে সুসংগঠিত রাখার শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সেতু। বর্তমান সরকার বাঙালির হাজার বছরের নিজস্ব কৃষ্টি, আচার ও সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে আরও সজীব ও পুনরুজ্জীবিত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য সঠিকভাবে পৌঁছাতে এমন আয়োজনের পরিধি বৃদ্ধি জরুরি।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। শত বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির উৎসবকে প্রতি বছর একইভাবে ধরে রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন আয়োজক ও এলাকাবাসী। ছবি সংগৃহীত।

