দীর্ঘ ৩০ বছরেও নির্মাণ হয়নি পাখিমারা খালের স্থায়ী সেতু!

দীর্ঘ ৩০ বছরেও নির্মাণ হয়নি পাখিমারা খালের স্থায়ী সেতু!

বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী):

“সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু আমাদের কপাল আর খোলে না”— পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কৃষি সমৃদ্ধ নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কৃষকদের মুখে এখন এমনই দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারা খালের ওপর আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সেতু নির্মিত হয়নি। প্রায় ৩০০ ফুট প্রশস্ত ও প্রমত্তা এই খাল পারাপারে প্রায় ৫টি গ্রামের কৃষকদের নিজেদের অর্থায়নে তৈরি জীর্ণ ভাসমান ড্রাম সেতুই এখন শেষ ভরসা। ঝুঁকিপূর্ণ এই নড়বড়ে সেতু দিয়ে প্রতিদিন শত শত কৃষক ও সাধারণ মানুষ যাতায়াত করছেন, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খালের ওপারে অবস্থিত কুমিরমারা, এলেমপুর, মজিদপুর, বাইনতলা ও ফরিদপুর—এই ৫টি গ্রামের কৃষকেরা প্রতি বছর কঠোর পরিশ্রমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার বিভিন্ন জাতের কৃষিপণ্য ও সবজি উৎপাদন করেন। উৎপাদিত এসব কৃষিপণ্য প্রতিদিন স্থানীয় পাখিমারা পাইকারি বাজারসহ রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন বড় বড় আড়তে পাঠানো হয়। কিন্তু স্থায়ী সেতুর অভাবে শুধুমাত্র খাল পারাপারের প্রতিবন্ধকতার কারণে পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। সময়মতো হাটে ও পাইকারি বাজারে পৌঁছাতে না পেরে অনেক সময় পচনশীল সবজি খালেই নষ্ট হয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষককুল।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

এলাকাবাসীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ২০১৬ সালে পার্শ্ববর্তী আরপাঙ্গাশিয়া নদীর ওপর চাকামইয়া এলাকায় ভেঙে পড়া একটি পুরনো আয়রন ব্রিজের কিছু মালামাল এনে কোনোমতে পাখিমারা খালের ওপর একটি সেতু বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণের মাত্র দুই বছরের মাথায় তা ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে সেই সেতুর কঙ্কাল ও ধ্বংসাবশেষ খালের পাশে অযত্নে পড়ে আছে। এর পর থেকে উপায়ন্তর না দেখে স্থানীয় কৃষকেরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চাদা তুলে ও বিভিন্ন এনজিওর আর্থিক সহায়তায় ড্রামের ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করেন। কয়েক দফায় মেরামত করা হলেও বর্তমানে সেই কাঠ-ড্রামের সেতুটিও চরম নড়বড়ে ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘রংধনু’-র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি  হুমায়ুন কবির জুয়েল শিকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পাঁচটি গ্রাম থেকে বছরে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার মানসম্মত কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। অথচ একটি ভাসমান সেতুর সীমাবদ্ধতার কারণে যাতায়াত ও গাড়ি ভাড়া বাবদ বাড়তি খরচ গুনতে গিয়ে কৃষকের লাভ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এখানে অবিলম্বে একটি শক্তিশালী গার্ডার ব্রিজ নির্মিত হলে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে এবং সবজির বাজারদরও নিয়ন্ত্রণে আসবে।”

একই সুরে আক্ষেপ প্রকাশ করেন স্থানীয় প্রবীণ কৃষক আজিজ হাওলাদার, আবু বকর মৃধা ও সুলতান গাজী। তারা জানান, কলাপাড়া উপজেলার মোট সবজি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ যোগান দেয় এই এলাকা। প্রতিদিন শত শত বাস, ট্রাক ও পিকআপে করে করলা, বেগুন, শসাসহ নানা ফসল দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে পাঠানো হয়। কিন্তু খালের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মালামাল পারাপার করতেই দিন পার হয়ে যায়, অনেক সময় নৌকায় করে তুলতেও বাড়তি অর্থ খসে যায়।

বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম জহির বলেন, “কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে ড্রাম ও কাঠের পাটাতন দিয়ে এই সেতুটি সামাল দিয়ে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে এটির স্থায়িত্ব শেষ। যেকোনো মুহূর্তে এটি ভেঙে বড় রকমের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন জানান, চলতি খরিফ-২ মৌসুমে শুধু কুমিরমারা গ্রাম থেকেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০০ মণ এবং কোনো কোনো দিন সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মণ পর্যন্ত মানসম্মত করলাসহ অন্যান্য সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু জীর্ণ সেতুর কারণে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় সরাসরি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা।

যোগাযোগ ব্যবস্থার এই দূরবস্থা নিরসনে কলাপাড়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান আশার কথা জানিয়ে বলেন, “পাখিমারা খালের ওপর নতুন ব্রিজ নির্মাণের স্থাপত্য ডিজাইনের কাজ বর্তমানে দ্রুতগতিতে চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স পাওয়া গেছে। নকশা চূড়ান্ত হলে এটি ডিপিপি (ডিপিপি) আকারে জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হবে। আমরা আশাবাদী খুব শীঘ্রই একনেক সভায় এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে।”

এদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন এবং কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ্ব মো. মনিরুজ্জামান মনির সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরে উক্ত স্থায়ী সেতুটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জোর তদারকি ও যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ছবি প্রতিবেদক।

আরো পড়ুন

স্বউদ্যোগে জনস্বার্থে খালের ওপর নিজের ৩ তলা ভবন ভাঙলেন রুস্তম খলিফা

সরকারি মিটারে বিএফডিসি'র ম্যানেজারের চার্জ বাণিজ্য!

১১ বছরের মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার মামলা করে বিপাকে দরিদ্র পরিবার

লালুয়া জনতা বিদ্যালয়ের পৌনে চারশ শিক্ষার্থীর হাতে গাছের চারা তুলে দিলেন ইউএনও

কলাপাড়ায় মাদকবিরোধী অভিযান : ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ৩ মাদক ব্যবসায়ী

১৬ মামলার দুর্ধর্ষ আসামি মাসুদ রানা এবার ইয়াবাসহ গ্রেফতার

‘প্রান্তজন’ ও ‘আমরা কলাপাড়াবাসী’র উদ্যোগে রাজপথে নামলেন শিক্ষার্থীরা

ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে কুয়াকাটা সৈকত !

অফিস মহল্লায় কলাপাড়া পুলিশের নৈশ অভিযান : ইয়াবাসহ সজিব, সৌরভ ও জয় আটক

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *