মোঃ মাসুদ রানা, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহের শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর কালীগঞ্জের প্রাণকেন্দ্রকে দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট ও ফুটপাত দখলের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কালীগঞ্জ পৌরসভা। ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ না করে স্থায়ী পুনর্বাসনের লক্ষ্যে শহরের নতুন বাজার সংলগ্ন মিনি স্টেডিয়ামের পূর্ব পাশে লেকঘেঁষা নতুন সলিং সড়কের ধারে একটি আধুনিক ‘হকার্স মার্কেট’ নির্মাণের সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
উক্ত হকার্স মার্কেট নির্মাণের উদ্দেশ্যে ইতিপূর্বে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিকট থেকে ৫ দশমিক ৭০ একর জমি কালীগঞ্জ পৌরসভার নামে আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞাপন
পৌরসভা ও সরেজমিন সূত্রে জানা গেছে, শহরের প্রধান বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে ব্যস্ততম বড়বাজারের নলডাঙ্গা রোড, কোলার রোড, থানা রোড এবং কলেজ রোডের দুই পাশের ফুটপাতজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় দেড় শতাধিক ক্ষুদ্র ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী পসরা সাজিয়ে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর ধারণক্ষমতা সংকুচিত হয়ে নিত্যদিন তীব্র ও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার পথচারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও যানবাহন চালকদের মারাত্মক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছিল।
উক্ত জনভোগান্তি লাঘবে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, “ফুটপাত দখলের কারণে শহরে সৃষ্ট যানজট দূর করা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুন্দর বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতেই এই হকার্স মার্কেট। যারা স্বেচ্ছায় ফুটপাত ছেড়ে মার্কেটে আসবেন, দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে তাঁদের শতভাগ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইতিপূর্বে পৌর প্রকৌশলীকে স্থায়ী নকশা প্রস্তুতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং তিন মাসের মধ্যে এটি চালুর লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু হতে যাচ্ছে।” তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানান, নির্ধারিত সময়সীমার পর কেউ ফুটপাতে থেকে গেলে আইনি প্রক্রিয়ায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।
হকার্স মার্কেট নির্মাণ কমিটির সভাপতি হামিদুল ইসলাম মনা জানান, ব্যবসায়ীদের নিয়ে ইতিপূর্বে এক দফা প্রাথমিক আলোচনা শেষ হয়েছে। খুব শীঘ্রই পৌর প্রশাসকের উপস্থিতিতে চূড়ান্ত সভা অনুষ্ঠিত হবে।
পৌর প্রকৌশলী কবির হাসান জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে মাটি সমতল করে নিচে ইটের গাঁথুনি এবং ওপরের অংশে টেকসই লোহার অ্যাঙ্গেল ও রঙিন টিনের ছাউনি দিয়ে শেড নির্মাণ করা হবে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে এটিকে আধুনিক বহুতল বাণিজ্যিক মার্কেটে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে।
এদিকে পৌরসভার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ ও স্থায়ী দোকান মালিকেরা। জহুরুল মার্কেটের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা বিশাল অঙ্কের জামানত ও পজিশন ভাড়ায় ব্যবসা করি। কিন্তু ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানের কারণে আমাদের মূল দোকানে ক্রেতা ঢুকতে পারতো না এবং পণ্যবাহী ট্রাক দাঁড় করানোর জায়গা মিলতো না। এই মার্কেট হলে শহরের ব্যবসার সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফিরবে।”
অন্যদিকে, পুনর্বাসনের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও স্থানান্তরের খরচ ও ব্যবসা জমার বিষয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কাপড় ব্যবসায়ী সলেমান হোসেন ও ফল বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা হকার্স মার্কেটে যেতে ইচ্ছুক, তবে নতুন জায়গায় গিয়ে বেচাকেনা জমতে কিছুটা সময় লাগবে। তাই দোকান অগ্রিম জামানত ও মাসিক ভাড়ার হার যেন আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সাধ্যের মধ্যে রাখা হয়।” তবে ডাব বিক্রেতা শাহজাহানের মতো অনেকেই আশা প্রকাশ করেছেন, নতুন জায়গায় পুনর্বাসিত হওয়ার পর প্রশাসন যেন পরবর্তীতে সেখান থেকে আবার তাঁদের উচ্ছেদের মুখোমুখি না করে। ছবি সংগৃহীত।


