বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের বহুমাত্রিক বরাদ্দ, উপবৃত্তি ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পরও চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। শিক্ষা অফিসের তদারকির অভাব, তীব্র শিক্ষক সংকট, কোচিং বাণিজ্য এবং শিক্ষকদের খেয়ালখুশিমতো অনুপস্থিতির কারণে বিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল সাড়ে ১০টায় কলাপাড়া পৌর শহরতলীর ১৫১ নম্বর বাদুরতলী (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরজমিনে গিয়ে দেখা মেলে এক করুণ চিত্র। জরাজীর্ণ পতাকাস্ট্যান্ডে উড়ছিল বিবর্ণ জাতীয় পতাকা। গত এক যুগেও কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি ভবনটিতে। প্রধান শিক্ষকের কক্ষটি খালি পড়ে ছিল এবং ক্লাসের নির্ধারিত সময়ে অধিকাংশ শিশু মাঠজুড়ে খেলাধুলা করছিল।
প্রাক-প্রাথমিকের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের জন্য নেই কোনো শিক্ষা উপকরণ বা খেলাধুলার সামগ্রী। হাজিরা খাতায় ২১ জনের নাম থাকলেও মেঝেকে বসে থাকতে দেখা গেছে ১০-১২ জন শিক্ষার্থীকে। ক্লাস নিচ্ছিলেন মাকসুদা পারভিন নামের এক শিক্ষিকা, যাঁর প্রাক-প্রাথমিক পাঠদানের ওপর কোনো প্রশিক্ষণই নেই। শুধু তাই নয়, প্রায় দেড় বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে বিদ্যালয়টির একমাত্র নলকূপটি। শৌচাগার ও ওয়াশ ব্লক অপরিচ্ছন্ন এবং তালাবদ্ধ থাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গরমে হাঁসফাঁস করা শিশুরা পাশের বাড়ি থেকে বকাঝকা খেয়ে পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সুমাইয়া নাসরিন টানা দুই যুগ ধরে একই স্কুলে কর্মরত রয়েছেন। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁর তদারকি বা অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারেন না। ঘটনার বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি জানান, নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনি উপজেলা পরিষদে আছেন। বরাদ্দ ও অনিয়ম সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যের জন্য তিনি শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, বর্তমানে কলাপাড়ার ১৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০৮টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য এবং ৪২টি সহকারী শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে। এমনকি খোদ উপজেলা শিক্ষা অফিসেই শূন্য রয়েছে ৫টি পদ।
বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়ে শিক্ষা সূত্রটি আরও নিশ্চিত করেছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থান করায় সম্প্রতি রসুলপুর সরকারি প্রাথমিকে মো. আরিফুর রহমান, চরচান্দুপাড়ার নাহিদ আক্তার সুমি ও মাঝেরপাড়ার মিমি রাখাইনকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকায় ইটবাড়িয়া প্রাথমিকে মাহমুদ আলম পলাশের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বহিষ্কৃত বা সাসপেন্ড অবস্থায় আছেন লতাচাপলির মো. জাকির হোসেন, তাহেরপুরের এমা ওয়েন ও আবুল হোসেন এবং সুলতানগঞ্জের আতিকুর রহমান খলিল।
সার্বিক সংকটের বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সাহিদা বেগম জানান, “অফিসের জনবল সংকট ও বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। শূন্য প্রধান শিক্ষক পদ পূরণে সহকারী শিক্ষকদের আবেদন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার সঠিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করা হচ্ছে।” ছবি পাঠিয়েছেন বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু।
