বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু (কলাপাড়া):
প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন পাম্প হাউস কিন্তু কল খুললেই বের হয় বালু! প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌরসভায় সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এখন মারাত্মক অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম তদারকিহীনতায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের এতিমখানা এলাকায় প্রায় ৭০ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা ব্যয়ে সদ্য নির্মিত পানির পাম্পটি থেকে প্রায় ৫৭ লক্ষ লিটার পানি উত্তোলনের পরপরই অনবরত বালু ওঠায় তা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগের পর সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি দায়সারা প্রতিবেদন দাখিল করলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো আইনি বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ‘ক’ শ্রেণীর এই পৌরসভায় মোট পানির গ্রাহক রয়েছেন ৪,৮৬০ জন। প্রতিদিন অন্তত ২৮ লক্ষ লিটার পানির চাহিদার বিপরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকলে মেলে মাত্র ১৫-২০ লক্ষ লিটার। জেনারেটর ক্রয়ে জালিয়াতির কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলেই বন্ধ হয়ে যায় পানি সরবরাহ। এতে অজু, গোসল, রান্না সহ গেরস্থালি সব কাজে ভোগান্তি বেড়েছে নাগরিকদের।
বিজ্ঞাপন
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে পৌরসভার তহবিল থেকে ১৯ লাখ টাকায় কেনা একটি জেনারেটর এবং ‘সিটিআইইপি’ প্রকল্প থেকে পাওয়া অপর জেনারেটরটিতে নতুন দেখিয়ে বিশাল বিল উত্তোলন করা হলেও মূলত স্বল্পমূল্যের সেকেন্ড হ্যান্ড জেনারেটর কেনা হয়েছিল। ফলে ঘন ঘন বিকল হওয়া এই জেনারেটরগুলো মেরামত দেখিয়ে প্রতিনিয়ত বিল ভাউচার তোলা হচ্ছে।
এছাড়া সদ্য নির্মিত পাম্পটিতে ইউপিভিসি (UPVC) পাইপের কেচিং বাদ দিয়ে, ১০৩০ থেকে ১১৩০ ফুট গভীরে অত্যন্ত নিম্নমানের ফিল্টার ব্যবহার করা হয়েছে। তড়িঘড়ি করে মূল পাইপের ৬ ইঞ্চি সংযোগটি সড়কের এক মিটার নিচে দেওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ১০ সেন্টিমিটার নিচে দেওয়া হয়। বিদ্যুত সংযোগে টুকরো ছেঁড়া তার ব্যবহার করায় তা চালু করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন পানি শাখার কর্মী মিজানুর রহমান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, ই-জিপি টেন্ডারে বরগুনার ‘কামাল এন্টারপ্রাইজ’ কাজটি পেলেও গোপনে তা বাস্তবায়ন করেন স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী। আর এতে তাদের অন্যতম ব্যবসায়ী অংশীদার ছিলেন সদ্য বিদায়ী বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউর রহমান। যিনি ইতিপূর্বে আমতলীতে এক সাংবাদিকের কলার ধরে ভাইরাল হয়েছিলেন এবং কলাপাড়া ছাড়ার সময় উৎকোচ ফেরত দিতে বাধ্য হন। প্রকৌশলী মশিউর টেকনিক্যাল সহকারী কর্মচারীদের ত্রুটি নিয়ে কথা না বলতে বদলির হুমকি দিতেন। অবশ্য মশিউর তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পাম্প নির্মাণ কাজের দুর্নীতি স্বীকার করে কামাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. কামাল খান বলেন, “পাম্পটি আমার লাইসেন্সে স্থানীয় কয়েকজন করেছিল। তবে কাগজে-কলমে এটি আমার হওয়ায় সম্পূর্ণ দায়ভার আমার। আমাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্টরা এটি দ্রুত সচল করতে কাজ করবে।”
কলাপাড়া পৌরসভার বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মজিবুল হায়দার জানান, এটি তাঁর যোগদানের আগের ঘটনা হলেও বিষয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়েছে। তারা ব্যর্থ হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে কলাপাড়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান জানান, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিমতে ১ বছর পর্যন্ত তাদের মেইনটেনেন্সের দায়িত্ব রয়েছে এবং তাদের জামানতের টাকাও পৌরসভার ব্যাংকে আটকে রাখা হয়েছে। খুব দ্রুতই এটি সচল করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” ছবি প্রতিবেদক।

