মো: মাসুদ রানা, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি :
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌরসভার আড়পাড়া, চাপালী ও শ্রীরামপুরসহ বিস্তীর্ণ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসতবাড়ির একেবারে ওপর দিয়ে বিপদজ্জনকভাবে ঝুলে রয়েছে ৩৩ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। বহুতল ও একতলা অনেক ঘরের ছাদ থেকে এই প্রাণঘাতী তারের দূরত্ব নেমে এসেছে মাত্র দুই থেকে আড়াই ফুটে। ফলে দুই শতাধিক পরিবারের শিশু, নারী ও প্রবীণসহ সকল অধিবাসী প্রতিদিন অবর্ণনীয় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন।
বিজ্ঞাপন
এলাকাবাসীর তথ্যমতে, প্রায় চার থেকে পাঁচ দশক পূর্বে এলাকাটি মূলত ফাঁকা ও জনমানবহীন থাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনটি প্রথম স্থাপন করা হয়। কালের পরিক্রমায় সেখানে ঘনবসতি গড়ে উঠলেও এই সুদীর্ঘ সময়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ লাইনটি অপসারণ কিংবা কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির ন্যূনতম উদ্যোগ নেয়নি বিদ্যুৎ বিভাগ। সময়ের সঙ্গে তারগুলো অস্বাভাবিক ঝুলে পড়ায় দিন দিন বিপদের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরেজমিনে আড়পাড়া, নদীপাড়া, মধুপট্টি, কোটচাঁদপুর রোড, দরগাপাড়াসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে দেখা যায়, অসংখ্য বসতঘরের চাল ও ছাদ ঘেঁষে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎপ্রবাহ চলে গেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক বাড়ির মালিক ছাদে ওঠার সিঁড়ি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন, বন্ধ রয়েছে ঘরবাড়ি মেরামত ও কাপড় শুকানোর সাধারণ কাজও।
বিজ্ঞাপন
নদীপাাড়ার প্রবীণ অধিবাসী মো. শওকত আলী ও ব্যবসায়ী আজগর আলী জানান, গত ৩০ বছরে এই ঝুলন্ত লাইনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অন্তত চার থেকে পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অনেকে। ২০২৩ সালেও কালুখালী গ্রামের এক রংমিস্ত্রি নদীপাড়ার এক বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে তাতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অকালে প্রাণ হারান। স্থানীয় আক্তার হোসেন দোলা আক্ষেপ করে জানান, কয়েক বছর পূর্বে ক্যাবল টিভির ডিসলাইনের তার সামান্য বিদ্যুৎ লাইনে লাগামাত্র বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে কয়েকটি বাড়ির টিভি, ফ্রিজ ও ফ্যান সম্পূর্ণ পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। নতুন বাড়ি নির্মাণ করা কিংবা নিজেদের জমিতে কাজ করাও এখন দুষ্কর হয়ে পড়েছে, এমনকি অতিষ্ঠ হয়ে অনেকে জমি বিক্রির ব্যর্থ চেষ্টাও করছেন।
জীবন-মরণের এই করুণ বাস্তবতায় দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে। এ বিষয়ে ঝিনাইদহ ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী দীন মোহাম্মদ মহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে বলতে পারবেন না জানিয়ে বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সবুক্ত গীনের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী সবুক্ত গীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই। কালীগঞ্জের আবাসিক প্রকৌশলীর কাছ থেকে জেনে নিন।
কালীগঞ্জে আবাসিক প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার (অফিস হেড) জয়দীপ সরকার বলেন, ‘লাইনটি অনেক আগে স্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে এটি রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। তবে লাইনটি সরানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ বিষয়ে আবেদন করা হলে আমি তা করতে পারি। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইস্টিমেট চাইবেন। ব্যয়ের হিসাব দেখার পর কর্তৃপক্ষ এটি এখনই করবে কি না, সেটি তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়।’
কোনো বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা লাশের মিছিল তৈরি হওয়ার পূর্বেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনটি অবিলম্বে সড়ক ঘেঁষে সরিয়ে নেওয়ার জোর দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। ছবি সংগৃহীত।

