স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
ফরিদপুরে সংঘবদ্ধ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে ইজিবাইক চালক বিশ্বনাথ সরকার (৫৫) হত্যার শিকার হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তথ্যপ্রযুক্তি ও সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ তদন্ত চালিয়ে এ ঘটনায় জড়িত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পিবিআই ফরিদপুর জেলা ইউনিট।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন—কামাল মিয়া (৪৬), সুমন আহম্মেদ (৩৬) এবং মো. মুরাদ শেখ (৩৭)। গ্রেপ্তারকৃত তিনজনই বিজ্ঞ আদালতে নিজেদের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন এবং ঘটনার সাথে জড়িত আরও চার সহযোগীর নাম প্রকাশ করেছেন।
মামলার বিবরণ ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৬ জুলাই সকাল ৮টার দিকে ফরিদপুর সদর উপজেলার কোতোয়ালি থানাধীন ইব্রাহীমদি গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বনাথ সরকার নিজের ইজিবাইক নিয়ে ভাড়ায় চালানোর উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর রাত সাড়ে আটটার দিকে একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে তিনি তা রিসিভ করেন। পরবর্তীতে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাঁকে জানায় যে, তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে অজ্ঞান ও অসুস্থ অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। পরিবারের লোকজন খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন ১৭ জুলাই সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বিজ্ঞাপন
এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের ছেলে রবিদাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় পেনাল কোডের ৩২৮/৩০২/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-৫৯, তারিখ: ১৮/০৭/২০২২)। পরবর্তীতে জেলা পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশক্রমে ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার পিবিআই ফরিদপুর জেলার কাছে ন্যস্ত করা হয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) অখিল কুমার বিশ্বাস।
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গত ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট কোতোয়ালি থানাধীন ঝিলটুলী এলাকা থেকে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত সন্দেহে কামাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোতোয়ালি থানার মুরারীদহ গ্রাম থেকে মাসুদ মল্লিকের বাড়ি হতে ছিনতাই হওয়া ইজিবাইকটি উদ্ধার করা হয়। একই দিনে কামালের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ভাঙা থানার মানিকদহ এলাকা থেকে সুমন আহম্মেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ধারাবাহিক তদন্ত ও নজরদারির অংশ হিসেবে গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে কোতোয়ালি থানাধীন ফলপট্টি এলাকা থেকে অপর আসামি মো. মুরাদ শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনা। ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে আসামি মুরাদ শেখসহ তার সহযোগীরা ফরিদপুর পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে নগরকান্দা থানার তালমার মোড় যাওয়ার কথা বলে ২০০ টাকা ভাড়ায় বিশ্বনাথ সরকারের ইজিবাইকটি ভাড়া নেয়। পথিমধ্যে কোতোয়ালি থানাধীন বাখুন্ডা মালিক সমিতির পেট্রোল পাম্পের নিকট পৌঁছালে তারা নির্জন স্থানে রুমালে অজ্ঞান করার ওষুধ মিশিয়ে চালক বিশ্বনাথ সরকারের নাক-মুখ চেপে ধরে। এতে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তাঁকে রাস্তার পাশে অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে আসামিরা ইজিবাইক নিয়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে তাঁর মৃত্যু হয়।
ছিনতাইয়ের পর আসামি মুরাদ শেখ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্য ধরে নিজের ভাগের ২৫ হাজার টাকা রেখে বাকি চার সহযোগীকে ২৫ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা দিয়ে ইজিবাইকটি নিজের দখলে রেখে দেয়। পরবর্তীতে ছিনতাইকৃত গাড়িটি সহজে রাস্তায় চালানো এবং বিক্রির উদ্দেশ্যে একটি ভুয়া ক্রয় রশিদও তৈরি করে চক্রটি। কিছুদিন নিজে গাড়িটি চালানোর পর মুরাদ সেটি ১ লাখ ১৭ হাজার টাকায় আসামি কামাল মিয়ার কাছে বিক্রি করে।
পিবিআই জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত পলাতক বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।
