বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পর্যটন নগরী কুয়াকাটায় সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া জমি বেরীবাধের ভেতরের লোকালয়ে নিজেদের দাবি করে জোরপূর্বক দখল ও ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় আব্দুর রব, আব্বাস, রশিদ, লাল মিয়া সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ২০ থেকে ২৫ জন নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে এ দখল কার্যক্রম চালায়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে খবর পেয়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে কুয়াকাটা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধেঁর বাইরে সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন ১৩৪৬ খতিয়ানের ৫১৭৮ দাগে ৫০টি দুস্থ ও অসহায় পরিবারকে ৬ শতক করে জমি ও ঘর নির্মাণ করে দেয় সরকার। পরবর্তীতে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের তাণ্ডবে এসব ঘরবাড়ি ও জমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহায়তায় কুয়াকাটা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রত্যেকের জন্য ৩ শতক জমি ও নতুন ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। তবে নানা অজুহাতে অনেকে সেই ঘর বিক্রি করে দিয়ে পুনরায় বেরীবাধের ঢালে এসে বসবাস শুরু করে। দীর্ঘ বছর পর গত দুই বছর আগে সমুদ্রে বিলীন হওয়া সেই জমি ফেরত চেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে ১৫ থেকে ২০ জন সুবিধাভোগী। অভিযোগ রয়েছে, মামলা দায়েরের পর তারা সৈকত লাগোয়া বেরীবাধের ভেতরে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীদের ক্রয়কৃত ভোগদখলীয় জমি নিজেদের দাবি করে একাধিকবার দখলের চেষ্টা চালায়।
ঘটনার বিষয়ে কুয়াকাটায় বিনিয়োগকারী আইনজীবী সিদ্দিকুর রহমান অভিযোগ করে জানান, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের সহায়তায় থাকার জায়গা নেই বলে দাবি করে তার জায়গার সামনের বেরীবাধের ঢালে আব্দুর রব, আব্বাস, রশিদ, লাল মিয়া ও ফাতেমা সহ কয়েকজন ঘর নির্মাণ করে। তারা প্রতিদিন তাকে নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দিয়ে আসছিল। সোমবার সকালে প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জোরপূর্বক সেখানে একটি টিনের ঘর তৈরি শুরু করে। এতে তার কেয়ারটেকার চান মিয়া বাধা দিলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। খবর পেয়ে মহিপুর থানা পুলিশ উপস্থিত হয়ে বাধা দিলে দখলকারীরা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিলেও নির্মিত টিনের ঘরটি সেখানেই থেকে যায়। এ সময় দখলকারীরা দাবি করে, তারা জমি ফেরতের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছে এবং আদালতের নির্দেশের কথা বলে ঘর নির্মাণ করছে। তবে রায় হয়েছে কি না জানতে চাইলে তারা জানায় কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক বিষয়টি জানেন।
বিজ্ঞাপন
আরো অভিযোগ রয়েছে, বেরীবাধ সংস্কারের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড আব্দুর রব সহ প্রত্যেককে ঘর সরিয়ে নিতে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিলেও অনেকেই ক্ষতিপূরণ নিয়েও স্থান ত্যাগ করেনি।
কুয়াকাটা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আলী হায়দার শেখ জানান, সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে সমুদ্রে বিলীন হওয়া জমি বেরীবাধের ভেতরে দাবি করে দখল করা এবং পরে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করাই এদের প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি আরো উল্লেখ করেন, রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া ঘরগুলো সমুদ্র সৈকত থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় অনেকেই তা বিক্রি করে পুনরায় বেরীবাধের ভেতরের সরকারি জমিতে ছালা বা ত্রিপল টাঙিয়ে বসবাস শুরু করে। পরে অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তারা কাঁচা ঘর তুলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিয়ত হয়রানি করছে।
কুয়াকাটা গ্র্যান্ড পার্ল হোটেল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, তাদের জমির সামনে বেরীবাধের ঢালে বসবাস করা বাবুল, আমির, জাকির ও আজিজের চারটি ঘর সরিয়ে নিতে ১২ লাখ টাকা দিতে হয়েছে, অন্যথায় তারা সেখান থেকে না যাওয়ার হুমকি দিয়েছিল। কোটি টাকা দিয়ে জমি কিনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে হতাশ হতে হচ্ছে বলে জানান বিনিয়োগকারীরা।
একইভাবে হয়রানির শিকার কলাপাড়া পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি ও দলিল লেখক আব্দুর মান্নান অভিযোগ করেন, তার জমিও কয়েকবার দখলের চেষ্টা চালিয়েছে চক্রটি। তিনি বলেন, আদালতে মামলা দায়েরের সুযোগ নিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী লোকের ইন্ধনে অসৎ উদ্দেশ্যে সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়া জমি বাধে দাবি করা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিনিয়োগকারীরা কুয়াকাটায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে না।
শশী কটেজের মালিক জানান, তার জমিতে নির্মিত কটেজে অতিরিক্ত পাকা স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। এর সামনে অর্ধশত নারী-পুরুষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জোরপূর্বক টিনের ঘর তৈরি করে। পরে পুলিশ গিয়ে দখলদারদের সরিয়ে দিলেও ঘর থেকে যায়। আব্দুর রব ও খালেক সহ কয়েকজন তার কটেজের সামনের স্থান দখল করে আছে। এতে পর্যটকদের ঢুকতে বাধা এবং গালিগালাজ করা হয়, এমনকি কেয়ারটেকারকেও মারধর করা হয়েছে। ফলে বিনিয়োগ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সার্বিক বিষয়ে মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাসুম হাওলাদার জানান, অভিযোগ পেয়ে দ্রুত পুলিশ পাঠিয়ে দখল কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উভয় পক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে থানায় তলব করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ইয়াসীন সাদেকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ছবি সংগৃহীত।
