স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
ঢাকার আশুলিয়ায় তালাবদ্ধ ঘর থেকে তিন দিন পর উদ্ধার হওয়া বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ‘ট্রিপল মার্ডার’ (গর্ভবতী নারী, তাঁর স্বামী ও অনাগত সন্তান)-এর অন্ধকার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই, ঢাকা জেলা)।
বিজ্ঞাপন
এই বর্বরোচিত ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি সম্পৃক্ত অভিযুক্ত আসামি মোঃ মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়কে (৪৪) হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। গ্রেফতারকৃত হৃদয় পূর্বে ২০১৪ এবং ২০২২ সালের দুটি পৃথক নৃসংষ হত্যা ও গণধর্ষণ মামলার সাজা ও জেলখাটা আসামি।
বিজ্ঞাপন
গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দিবাগত রাতে পিবিআই ঢাকা জেলার অধিনায়কের নির্দেশনায় তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে একটি চৌকস টিম আশুলিয়া থানার নরসিংহপুর এলাকা থেকে অভিযুক্ত হৃদয়কে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারের পর পিবিআইয়ের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে হৃদয় ট্রিপল মার্ডারের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য মতে নিজ ভাড়া বাসা থেকে ভিকটিম নাজমার ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, সিমকার্ড, অফিসের পরিচয়পত্র ও ভ্যানিটি ব্যাগ (পার্স) উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাসূত্রে জানা গেছে, গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আশুলিয়ার একটি তালাবদ্ধ ঘর থেকে তিন দিন আগের অর্ধগলিত ৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ছিলেন— ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় আলমগীর (৪৫), খাটের ওপর পড়ে থাকা তাঁর অন্তর্বাস দৃশ্যমান স্ত্রী নাজমা বেগম (৩৫) এবং পেটে আঘাতের ফলে অকাল গর্ভপাত ঘটে ভূমিষ্ঠ হওয়া মৃত এক নবজাতক। এ ঘটনায় নিহত নাজমার বড় বোন মোসাঃ শাপলা বেগম বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-৩০, ধারা-৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোড) দায়ের করেন। ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে পিবিআই ঢাকা জেলা স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে এবং এসআই (নিঃ) আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে ছায়াতদন্ত শুরু করে।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামির জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ট্রিপল মার্ডারের ভয়াল আখ্যান। পিবিআই জানায়, আসামি হৃদয় পেশায় সবজি বিক্রেতা এবং ভিকটিম আলমগীরের সাথে পূর্বপরিচিত ছিল। তবে বিয়ের পূর্ব থেকেই আলমগীরের স্ত্রী নাজমার সাথে হৃদয়ের পরকীয়া ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে আলমগীরের সাথে হৃদয়ের তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং একাধিকবার শাসানো হয়।
ঘটনার দিন (২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) পরকীয়া সম্পর্কের বিরোধ নিষ্পত্তির কথা বলে আলমগীর ও নাজমা হৃদয়কে ডেকে নিজ বাসায় নিয়ে যায়। বাসায় পৌঁছানোর পর হৃদয়কে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তারা উভয়ে মিলে তাঁকে বেধড়ক মারধর ও ঝাঁটা দিয়ে আঘাত করা শুরু করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হৃদয় গর্ভবতী নাজমার পেটে সজোরে তীব্র লাথি মারলে নাজমা খাটের ওপর লুটিয়ে পড়েন। আঘাতের চোটে ঘটনাস্থলেই নাজমার পেটের সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নাজমা ও অনাগত সন্তান মারা যায়।
স্ত্রীর মৃত্যু ও মারধর দেখে স্বামী আলমগীর খুন্তি ও রড/পাইপ দিয়ে হৃদয়কে পাল্টা আঘাত করলে হৃদয় উন্মাদ হয়ে আলমগীরের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা নিশ্চিত করে। পরবর্তীতে ঘটনাটি আত্মহত্যা বানাতে আলমগীরের মৃতদেহ ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে রেখে দরজায় তালা মেরে এবং নাজমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র লুটে নিয়ে পালিয়ে যায় হৃদয়।
পিবিআই ঢাকা জেলার অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে যে, গ্রেফতারকৃত হৃদয় একজন দুর্ধর্ষ ও পেশাদার সিরিয়াল অপরাধী। এর আগে ২০২২ সালে আশুলিয়ায় এক নারী দোকানদারকে বাগানে নিয়ে দুই সহযোগীকে সাথে নিয়ে গণধর্ষণ ও পরবর্তীতে হত্যার ঘটনায় ২০২৩ সালে অভিযুক্ত হিসেবে চার্জশিটভুক্ত হয় সে। ৭ মাস জেল খেটে উচ্চ আদালতের জামিনে বের হয়ে সে ফের এই নৃশংসতা চালায়।
এছাড়া এর আগে ২০১৪ সালে নিজের গ্রাম ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা থানার একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলারও (মামলা নং-২২, ধারা-৩০২) এজাহারনামীয় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে দীর্ঘ দিন জেল খেটেছিল এই হৃদয়।
ঘটনাস্থলে অন্য কোনো সহযোগী বা ভাড়াটে ঘাতকের উপস্থিতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে পিবিআইয়ের তদন্ত কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।ছবি সংগৃহীত।


