মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি:
এক কাপ চা। কখনো গল্প-আড্ডার সঙ্গী, কখনো ক্লান্তি দূর করার পথ, আবার কখনো বা ব্যস্ততার মাঝে কয়েক মিনিটের পরম স্বস্তি। মাগুরার মহম্মদপুরের হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ড কিংবা রাস্তার পাশের ছোট-বড় চায়ের দোকানগুলোতে প্রতিদিন শত শত মানুষ চা পান করেন। কিন্তু সেই চেনা ও পরিচিত চায়ের কাপের আড়ালেই কি লুকিয়ে রয়েছে বড় কোনো অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি?
মহম্মদপুর উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন হাট-বাজার ও রাস্তার পাশের বেশ কিছু চায়ের দোকানে সরেজমিনে দেখা গেছে, দ্রুত পানি গরম করা ও চা বানানোর কাজে ইলেকট্রিক বা বৈদ্যুতিক প্লাস্টিক জগ এবং হিটার ব্যবহার করা হচ্ছে। দোকানিদের দাবি, সময় ও জ্বালানি খরচ বাঁচাতে তারা এই আধুনিক পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। তবে সাধারণ প্লাস্টিকের তৈরি এই পাত্রগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় পানি ফুটানোর ক্ষেত্রে আদৌ কতটুকু নিরাপদ ও ‘ফুড গ্রেড’ (খাদ্যোপযোগী), তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা উদ্বেগ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন চায়ের দোকানে সরাসরি প্লাস্টিকের তৈরি বৈদ্যুতিক জগে পানি ফুটানো হচ্ছে। পানি দ্রুত ফুটে উঠলে তা দিয়েই চা বানিয়ে ক্রেতাদের দেওয়া হচ্ছে। অনেক জায়গায় একই জগে সারাদিন বারবার পানি গরম করার কাজ চলছে। চা দোকানিরা জানান, গ্যাসের চুলা বা কয়লার আগুনের চেয়ে এই বৈদ্যুতিক জগে পানি দ্রুত গরম হয়। ফলে ব্যস্ত সময়ে গ্রাহকদের খুব দ্রুত চা সরবরাহ করা সম্ভব হয়। কিন্তু এই প্লাস্টিক উত্তপ্ত হলে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক বা মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।
বিজ্ঞাপন
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ধরনের প্লাস্টিক উচ্চ তাপমাত্রার তাপ সহ্য করার মতো ফুড গ্রেড মানের হয় না। নির্দিষ্ট খাদ্যোপযোগী প্লাস্টিক ছাড়া সাধারণ প্লাস্টিকের পাত্রে অতিরিক্ত তাপে পানি ফুটালে রাসায়নিক উপাদান পানিতে মিশে যাওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে। মহম্মদপুরের অধিকাংশ দোকানিই পাত্র কেনার সময় তা ‘ফুড গ্রেড’ বা তাপসহনীয় কি না, সে বিষয়ে খেয়াল করেন না।
উচ্চ তাপমাত্রায় অপ্রমাণিত ও অনুপযুক্ত প্লাস্টিক ব্যবহারের ফলে ক্ষতিকর উপাদান তরলে মিশে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানান চিকিৎসকরা। বিশ্বজুড়ে খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ ও তার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা চলছে। এ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত তাপে সাধারণ প্লাস্টিকের ব্যবহার পরিহার করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
বিষয়টি সম্পর্কে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কাজী আবু আহসান জানান, “খাবার বা পানীয় তৈরির কাজে উচ্চ তাপমাত্রায় সাধারণ বা অননুমোদিত প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করা মোটেও উচিত নয়। চায়ের দোকানে প্লাস্টিক জগে পানি গরম করার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এর বদলে স্টেইনলেস স্টিল, কাচ বা সুনির্দিষ্ট তাপসহনীয় খাদ্যোপযোগী পাত্র ব্যবহার করাই একমাত্র নিরাপদ উপায়।”
ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়া:
মহম্মদপুর বাজারের নিয়মিত চা পায়ী আব্দুল হালিম শেখ বলেন, “আমরা তো দ্রুত এক কাপ চা পাওয়ার আশাতেই দোকানে আসি। কিন্তু প্লাস্টিক জগে পানি ফুটালে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে, তা আমাদের জানাই ছিল না। এটি জানার পর এখন থেকে সতর্ক হতে হবে।”
বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহল থেকে প্রশাসনিক নজরদারির তাগিদ দেওয়া হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বেদবতী মিস্ত্রী বলেন, “জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হবে। চায়ের দোকানগুলোতে অনুপযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর প্লাস্টিক পাত্রে পানি ফুটানো হচ্ছে কি না, তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখে খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এক কাপ চায়ের দাম সামান্য হলেও অস্বাস্থ্যকর ও অনুপযুক্ত পাত্র ব্যবহারের ফলে তৈরি স্বাস্থ্যঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে বেশ বড় হতে পারে। সামান্য সময় বা খরচ বাঁচানোর তাগিদে যেন সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য কোনো ঝুঁকিতে না পড়ে, সে বিষয়ে দোকানিদের সচেতনতা ও প্রশাসনের তদারকি একযোগে বাড়ানো প্রয়োজন। ছবি সংগৃহীত।

