স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাতিতিলা তিয়ামিপুর তাহযীবুল উম্মাহ দাখিল মাদ্রাসায় বিপুল অঙ্কের আর্থিক দুর্নীতি, ভুয়া ভাউচার তৈরি, ভুয়া নিয়োগ বাণিজ্য ও শিক্ষকদের টিউশন ফি আত্মসাতের এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত এবং ইআইআইএন নম্বর ১১৫৭১১ বিশিষ্ট এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সুপার মো. শহিদুল ইসলাম বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে বিস্ফোরক সব তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা টিউশন ফি বাবদ মোট ৩ লাখ ৬৩ হাজার ২০০ টাকা নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে বণ্টন করার কথা থাকলেও সুপার তা পুরোটাই পকেটে পুরেছেন। উক্ত টাকা মাদ্রাসার কোনো অফিশিয়াল তহবিলেও জমা করা হয়নি। এছাড়াও ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসার নিয়মিত আয় থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান দেখানো হলেও বাস্তবে তার কোনো উপযুক্ত প্রমাণ মেলেনি। এই খাতেই ভুয়া তথ্য দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ২৪৬ টাকা।
আর্থিক জালিয়াতির এখানেই শেষ নয়; উক্ত দশ বছরে মাদ্রাসার বিভিন্ন ভুয়া খরচ দেখিয়ে কোনো ধরনের বৈধ ভাউচার ছাড়াই ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭৪০ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাদ্রাসার নিজস্ব মাটি ইটভাটার ঠিকাদারের কাছে ইট-বালু রাখার জন্য ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত ৩৬ হাজার টাকাও মাদ্রাসার কোনো উন্নয়ন কাজে ব্যবহার না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে বড় অনিয়মের ঘটনা ঘটে ২০১৯ সালে মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত করার নামে। এমপিওভুক্তির দাপ্তরিক কাজের কথা বলে যশোর সদর উপজেলার মাহিদিয়া সন্মিলনী মহিলা আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. ফারুক হোসেনের কাছে মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত মোট ৯ লাখ টাকা সুপার শহিদুল ইসলামের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় উক্ত কাজের খরচ বাবদ ৪ লাখ টাকা কেটে রেখে অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা নগদ ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু সেই ফেরত আসা ৫ লাখ টাকাসহ শিক্ষক মো. মতিউর রহমান সাঈদের ১ লাখ টাকাসহ মোট ৬ লাখ টাকা সুপার শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে ফেরত না দিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করে বসে আছেন।
নিয়োগ বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করেননি এই বিতর্কিত সুপার। সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে, কোনো নিয়োগ বোর্ড গঠন না করে বিভিন্ন কাগজের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে তিনি একাধিক ভুয়া নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগকালে ইবতেদায়ী প্রধান মোছা. শাহানারা খাতুনের কাছ থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ইবতেদায়ী মৌলভী মোছা. নারগিস পারভীনের কাছ থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, আয়া মোছা. সুমিতা খাতুনের কাছ থেকে ৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. জুবায়েদ হোসেনের কাছ থেকে ৪ লাখ ৮০ টাকা (প্রকৃত প্রস্তাবে প্রায় ৫ লাখ টাকা) এবং সহকারী সুপার মো. মহিদুল ইসলামের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা সর্বমোট ২২ লাখ ৪০ হাজার টাকা গ্রহণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, মোছা. শাহানারা খাতুন ও মোছা. নারগিস পারভীনকে ২০২২ সালে অবৈধ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৮ সালে আয়া সুমিতা খাতুন, ২০১৯ সালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী জুবায়েদ হোসেন এবং ২০২৩ সালে সহ-সুপার মহিদুল ইসলামকে নিয়োগ দিয়ে বিপুল অংকের অর্থ বাণিজ্য করা হলেও তার কোনো সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত মাদ্রাসার রেজিস্টারে বা উন্নয়ন ফান্ডে জমা দেওয়া হয়নি। এভাবে একের পর এক দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও সুনির্দিষ্ট তথ্যের কোনো তোয়াক্কা করছেন না অভিযুক্ত মাদ্রাসা প্রধান । উত্তাপিত এসব অনিয়ম, আর্থিক আত্মসাৎ ও হুমকির বিষয়ে অভিযুক্ত মাদ্রাসা সুপারের বক্তব্য গ্রহণের জন্য ০১৮৩৮৩৮৩৮৪৪ নাম্বার থেকে তাঁর ব্যবহৃত দু’টি ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে (01724432572\01309115711) একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে বিপরীত প্রান্ত থেকে তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা সত্ত্বেও সাড়া না দেওয়ায় তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি(চলবে)। ছবিটি গুগল ম্যাপ থেকে সংগৃহীত।
