স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আগামীকালের ১১ দলীয় ঐক্যের তৃতীয় দফার লংমার্চ অত্যন্ত সফল ও সার্থক হবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, জনগণের মৌলিক সাত দফা দাবি আদায় এবং বর্তমান সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তীব্র প্রতিবাদ জানাতেই এই লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু হয়ে খুলনা, যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৪১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুদীর্ঘ কর্মসূচিতে দেশের ১৯টি জেলার সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থকরা অংশ নেবেন। এই বহরে শেষ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হওয়ার জোরালো প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর ২০২৬) বেলা ১১টায় রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। লংমার্চের সার্বিক প্রস্তুতি ও কর্মসূচি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরার জন্যই মূলত এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, গণভোটের প্রকৃত গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের তীব্র সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কঠোর হাতে রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব চিরতরে বন্ধ করা, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও উল্লেখ করেন, একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি নির্বাচনের ফলাফলের একটির ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও অন্যটির ফলাফল সরাসরি অস্বীকার করা হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। আগামী ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের মাধ্যমে সরকার চাইলে এই বিষয়ে কার্যকর ও দূরদর্শী উদ্যোগ নিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্রুত বিচার এবং এর সঙ্গে জড়িতদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারের জোরালো দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সেই ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষ নির্মমভাবে শহীদ হয়েছেন এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই এখনো দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কিংবা বিদেশে যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের চরম সংকট দ্রুত সমাধান এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী মূল্য নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সর্বব্যাপী দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দলীয়করণের চিত্র তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, দেশজুড়ে হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা, টেন্ডারবাজি ও জবরদখল এখনো অব্যাহত রয়েছে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেকোনো ধরনের দলীয় প্রভাবের জিম্মি দশা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তিনি।
লংমার্চের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে জানাতে গিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের অন্তর্ভুক্ত শরিক দলগুলো স্ব স্ব অবস্থান থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জামায়াতের পক্ষ থেকেও সর্বাত্মক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের পুলিশ প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আগে থেকেই কার্যকর সমন্বয় করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সর্বাত্মক সহযোগিতার অভয় দেওয়া হয়েছে।
তিনি লংমার্চের পূর্ণাঙ্গ সূচি প্রকাশ করে জানান, আগামীকালের এই কর্মসূচির উদ্বোধন হবে সকাল ৭টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে। সেখানে ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেবেন। পরবর্তীতে সকাল ৮টায় প্রায় ছয় শতাধিক গাড়ির মূল বহর যাত্রা শুরু করবে। পথিমধ্যে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আরও অসংখ্য গাড়ি এই বহরে যুক্ত হয়ে চূড়ান্তভাবে তা প্রায় দেড় হাজার গাড়ির দীর্ঘ বহরে রূপ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী লংমার্চের গাড়ি বহরটি সকাল ৯টায় শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায়, সকাল ১১টায় বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়ে, দুপুর সাড়ে ১২টায় খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বরে এবং দুপুর ২টায় ফুলতলার স্বাধীনতা চত্বরে পথসভায় মিলিত হবে। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টায় যশোরের মুড়লীর মোড় এবং বিকেল ৫টায় ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে রাত সাড়ে ৮টায় কুষ্টিয়ার ঐতিহাসিক শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে একটি বিশাল সমাপনী জনসভার মধ্য দিয়ে এই লংমার্চ কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটবে।
মহাসড়কে চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের সাময়িক যাতায়াত ভোগান্তির আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, লংমার্চ চলাকালে যানবাহন চলাচল এবং সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। এর জন্য তিনি দেশবাসী, সাধারণ মানুষ, পরিবহন শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের কাছে আগেই ক্ষমা চেয়ে নেন। জনদুর্ভোগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে মহাসড়কের এক পাশ ব্যবহার করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কর্মসূচি পরিচালনার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে বলেও তিনি নিশ্চয়তা দেন।
লংমার্চে অংশগ্রহণকারী সকল স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতি চরম ধৈর্য, সংযম ও সর্বোচ্চ শৃঙ্খলা বজায় রাখার কঠোর আহ্বান জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো অবস্থাতেই কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, স্লোগান কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করে এমন কোনো শালীনতাবহির্ভূত আচরণ করা যাবে না। যাত্রাপথে সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষা, জরুরি চিকিৎসা সেবা, অ্যাম্বুলেন্স চলাচল, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং গণমাধ্যম টিম অত্যন্ত সুসমন্বিতভাবে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। দীর্ঘ এই যাত্রার কথা মাথায় রেখে নেতাকর্মীদের সঙ্গে পর্যাপ্ত খাবার, সুপেয় পানি, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সঙ্গে রাখার পাশাপাশি গাড়ির টোলের টাকাও আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট মুয়াযম হোসাইন হেলাল, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনসহ দলটির কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
পরিশেষে, সুশৃঙ্খল ও জনকল্যাণমুখী এই লংমার্চকে সফল করতে দেশের আপামর জনসাধারণ, সকল রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রশাসন, সংবাদকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহের সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ছবি সংগৃহীত।

