স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে জমি ও পারিশ্রমিক সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে গিয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় মনোরঞ্জন রায় (৫৫) নামের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিহত হয়েছেন। এ মর্মান্তিক ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামিসহ দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানাধীন বেলাইচণ্ডী ইউনিয়নের সোনাপুকুর নয়া মোল্লাপাড়া গ্রামে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিহত মনোরঞ্জন রায় পার্শ্ববর্তী চিরিরবন্দর থানার চক সুকদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি চিরিরবন্দর উপজেলার চক সুকদেবপুর এলাকায়।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পার্বতীপুরের নয়া মোল্লাপাড়া গ্রামের প্রয়াত শিক্ষক আজিজুল হকের বাড়ির নির্মাণকাজের পারিশ্রমিক, কাঠমিস্ত্রির মজুরি ও ইউক্যালিপ্টাস গাছের হিসাব নিয়ে আজিজুল মাস্টারের ছেলে আল-রোমানের সঙ্গে কাঠমিস্ত্রি ফরতাজ হোসেনের বিরোধ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি বাড়ির পাশের রাস্তার জমি নিয়ে আল-রোমানদের সঙ্গে প্রতিবেশী মোস্তাহার হোসেনের ছেলে আশিকুজ্জামান আলো মিয়া ও তার ভাই আসাদুজ্জামানের দীর্ঘদিনের মনোমালিন্য চলছিল। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, আসামি আলো মিয়া স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল এবং বিভিন্ন সময় এলাকায় ঝগড়া-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে আসছিল।
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, প্রয়াত শিক্ষক আজিজুল হকের মৃত্যুর পর গত প্রায় ১৩ বছর ধরে তাঁর পরিবারের অভিভাবক হিসেবে সার্বিক দেখভাল করে আসছিলেন তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়। সে সুবাদে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচিতি ছিল। রোববার দুপুরে জমি ও পারিশ্রমিকের বিরোধের জেরে ফরতাজ হোসেন, আলো মিয়া ও আসাদুজ্জামান আল-রোমানদের বাড়িতে চড়াও হয় এবং আল-রোমানের মা রোমানা আক্তারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। এ সময় পরিস্থিতি শান্ত করতে ও বিরোধ মীমাংসা করার উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়।
একপর্যায়ে উত্তেজিত আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে মধ্যস্থতাকারী শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়ের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। সজনে গাছের ডাল ও লাঠিসোঁটা দিয়ে তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। আত্মরক্ষার্থে তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে ধাওয়া করে পিটিয়ে আহত করা হয়। মারাত্মক শারীরিক আঘাতে তিনি নিকটস্থ একটি ধানক্ষেতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে উদ্ধার করে প্রয়াত শিক্ষক আজিজুল হকের বাড়িতে নিয়ে আসা হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পার্বতীপুর থানা পুলিশের একটি টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার খবর পেয়ে দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. জেদান আল মুসা, পিপিএম এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আনোয়ার হোসেন, বিপিএম-সেবা সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি জনাব মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ, বিপিএম মহোদয়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় আসামিদের গ্রেপ্তারে নামেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
পুলিশের তাত্ক্ষণিক তৎপরতায় ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল থেকে আসাদুজ্জামানকে (৩২) এবং ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে চিরিরবন্দর থানার হাসিমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মামলার প্রধান আসামি আশিকুজ্জামান আলো মিয়াকে (৩৫) গ্রেপ্তার করা হয়।
পার্বতীপুর থানা পুলিশ জানায়, নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে যে শিক্ষক মনোরঞ্জন রায় দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন, তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেলেই তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

