মাগুরা প্রতিনিধি:
মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টারে মো. শাকের হোসেন (৩৯) নামে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোরে কাউন্টার থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের সময় তাঁর মাথার খুলির ভেতর থেকে একটি বুলেট পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে গুলির আঘাতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছেন চিকিৎসকেরা।
নিহত শাকের হোসেন মাগুরা পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টার মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি মাগুরা পৌরসভার পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়ায়। তিনি মৃত কুতুবউদ্দিনের ছেলে।
মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থান্দার খায়রুল হাসান জানান, মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে শাকেরের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসকেরা তাঁর মাথার খুলির ভেতরে বুলেট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বিজ্ঞাপন
কাউন্টারে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় শাকেরকে –
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে পারনান্দুয়ালী বাস টার্মিনালে রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টারে অচেতন অবস্থায় শাকেরকে পাওয়া যায়। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। প্রথমে অসুস্থতাজনিত মৃত্যু মনে করে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যান। গোসলের প্রস্তুতির সময় মাথার পেছনে ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেয়ে তাঁরা পুলিশকে খবর দেন। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, একটি মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি এসে শাকেরকে গুলি করে পালিয়ে যান। তবে হামলাকারীদের পরিচয়, হত্যার উদ্দেশ্য এবং ব্যবহৃত অস্ত্র সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সিসিটিভির অডিওতে দুটি গুলির শব্দ-
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাস টার্মিনালের প্রবেশমুখে জেলা পুলিশের স্থাপিত একটি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। ওই ক্যামেরার অডিওতে ঘটনার সময় দুটি গুলির শব্দ শোনা গেছে। ঘটনার কাছাকাছি সময়ে কয়েকটি মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হতে দেখা যায়।
তবে ক্যামেরার দিক থেকে সংশ্লিষ্ট কাউন্টারটি আড়ালে থাকায় হামলার দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার সময় কাউন্টারের ভেতরে থাকা দুই যাত্রী ঢাকায় যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে পুলিশ।
পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ সংসদ সদস্যের-
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বুধবার দুপুরে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন সদর হাসপাতালে গিয়ে নিহতের মরদেহের বিষয়ে খোঁজ নেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ময়নাতদন্তে মাথার খুলির ভেতরে বুলেট পাওয়ার তথ্য চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, শাকেরকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, হত্যার কারণ উদ্ঘাটন এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পুলিশ প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
দুপুরে মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীও সদর হাসপাতালে যান। এদিকে, হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে দুপুর ১২টার দিকে বাস টার্মিনাল এলাকায় মিছিল করেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এ সময় কিছুক্ষণের জন্য ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করা হয়।
‘আমার বাচ্চাদের দেখবে কে’-
শাকেরের মৃত্যুর খবরে তাঁর বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। স্বামীকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন স্ত্রী শারমিন আক্তার রুমা। তাঁদের দুই সন্তান রয়েছে। একজন পঞ্চম শ্রেণিতে এবং অন্যজন নার্সারিতে পড়ে।
রুমা জানান, প্রতিদিন ভোরে শাকের কাউন্টারে কাজের জন্য বাড়ি থেকে বের হতেন। ঘটনার দিনও তিনি প্রতিদিনের মতো কাজে গিয়েছিলেন। স্বামীর সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কারও সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক ছিল বলে তাঁর জানা নেই। শাকের সবার সঙ্গে মিশতেন বলেও দাবি করেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমা বলেন, “কে আমার স্বামীকে নিয়ে গেল, আপনারা বের করে দেন। যে এই কাজ করেছে, তাকে খুঁজে বের করে আমার সামনে আনুন।”
স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে চলবেন, তাদের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা কী হবে—এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ছবি সংগৃহীত।

