যশোরের বঙ্গবাজারে ‘ফ্রি স্যাম্পল’ ওষুধের রমরমা হাট

যশোরের বঙ্গবাজারে ‘ফ্রি স্যাম্পল’ ওষুধের রমরমা হাট

বিশেষ প্রতিবেদক :

রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া আর আইনের চোখে ধুলো দেওয়ার এক অভিনব দৃশ্য দেখতে হলে এখন আর গভীর জঙ্গলে যাওয়ার দরকার নেই, খোদ ঝকঝকে তকতকে যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র চিত্রা মোড়েই তার চমৎকার প্রদর্শনী চলছে। চিত্রা মোড়ের বঙ্গবাজারের প্রধান ফটকে পা রাখতেই যে কারোর চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হবে। গেটের মুখেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা হাসান ফার্মেসি, বাঁধন ফার্মেসি এবং ঠিক তাদের পাশেই সাইনবোর্ডহীন আরেকটি নামবিহীন দোকান—এই ত্রয়ীর যৌথ কারসাজিতে সেখানে গড়ে উঠেছে ফ্রি স্যাম্পল ওষুধের জমজমাট এক উন্মুক্ত হাট। সবচেয়ে মজার এবং বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো, এই রমরমা কারবারটি চলছে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের ঠিক নাকের ডগায়, যেন রীতিমতো আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে থমকে থাকা ঘড়িকেও হার মানানোর উপক্রম!

নিয়ম অনুযায়ী, ওষুধ কোম্পানিগুলো দেশের অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায় সহায়তার জন্য চিকিৎসকদের বিনামূল্যে ‘ফিজিশিয়ান স্যাম্পল’ হিসেবে এই ওষুধগুলো দিয়ে থাকে। যার গায়ে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা থাকে ‘বিক্রয়ের জন্য নিষিদ্ধ’ বা ‘নট ফর সেল’। কিন্তু কে শোনে কার কথা! চিকিৎসকদের অনেকেই সেই ফ্রি মাল পকেটে পুরে সটান হাজির হন এই সমস্ত অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে। এরপর নামমাত্র মূল্যে তা বিক্রি করে দেওয়া হয়, আর সেই ট্যাক্সবিহীন ফ্রি ওষুধগুলোই আবার চড়া দামে গিলিয়ে দেওয়া হয় সাধারণ ও সরলপ্রাণ রোগীদের পেটে। সরকারের কোষাগারে এক পয়সা ট্যাক্স না দিয়ে এভাবে লাখ লাখ টাকার স্যাম্পল ওষুধের অবৈধ রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এই চক্রটি।

অথচ দেশের প্রচলিত ড্রাগ আইন অনুযায়ী, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল বা চিকিৎসকদের বিনামূল্যে প্রদর্শিত ওষুধ খোলা বাজারে কেনাবেচা করা সম্পূর্ণ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। ওষুধ আইন এবং জাতীয় ঔষধ নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, এই ধরনের স্যাম্পল বিক্রি করা তো দূরের কথা, কোনো খুচরা বা পাইকারি দোকানে মজুত রাখাই অবৈধ। কিন্তু কে মানে কার আইন?

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে যশোর জেলা ড্রাগ এন্ড কেমিস্ট সমিতির সভাপতি বিলু এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, তাঁরা নাকি এই তিন দোকানদারকে বারবার হাত-পা জোড় করে নিষেধ করেছেন, কিন্তু সাপের লেজে পা দিলে যা হয়, ওই ব্যবসায়ীরা তাদের কোনো কথাই কানে তোলেনি। মাঝেমধ্যে জেলা প্রশাসন থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান এলেও তারা সামান্য কিছু জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যায়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, জরিমানা আদায় করা হলেও দোকান থেকে ওই অবৈধ ওষুধগুলো জব্দ করা হয় না কিংবা জনসমক্ষে ধ্বংসও করা হয় না! ফলে জরিমানা মিটিয়েই ওই একই স্যাম্পল দিয়ে তারা পরদিন থেকে আবার নতুন উদ্যমে ব্যবসা ফেঁদে বসে। ড্রাগ সমিতির নেতাদের অবস্থাও এমন যে, তারা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না।

অন্যদিকে, এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের যশোর জেলার সহকারী পরিচালক সুলতানা রিফাত ফেরদৌসের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, এ ধরনের কার্যক্রম কোনো মতেই বৈধ হতে পারে না। বিষয়টি জানার পর তারা নড়েচড়ে বসেছেন এবং দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, কোনো অবস্থাতেই এই অবৈধ ও জনস্বাস্থ্যবিরোধী কারবার চলতে দেওয়া হবে না।

কথা হলো—প্রশাসনের এমন ‘খোঁজ নিচ্ছি’, ‘পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে’ জাতীয় আশ্বাস দেখতে দেখতে এলাকার সচেতন মহলের চোখ এখন কপালে উঠে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কোন জাদুমন্ত্র বা কার অদৃশ্য ছাতার তলে দিনের পর দিন এই অবৈধ ব্যবসা চলছে? কাদের খুঁটির জোরে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এই সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে রয়েছে?

কারা রয়েছে এই রমরমা স্যাম্পল বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের নেপথ্যে? অভিযুক্তদের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি এবং আসল রহস্য ভেদ করতে চোখ রাখুন আমাদের পরবর্তী বিশেষ পর্বে। ছবি সংগৃহীত।

আরো পড়ুন

হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সমতাভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করতে যশোরে বিশেষ সংলাপ

চৌগাছার মাদক মামলায় আশিকুরের ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড

যশোরে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি

চৌগাছায় গোয়ালঘরে আগুন : জীবন্ত পুড়ে মারা গেল গরু, ৭০ কবুতর দগ্ধ

যশোরে সিটি কলেজের পাশে ছুরিকাঘাতে আহত ছাত্রদল নেতা ফয়সাল হাসান তদ্রব

অভয়নগরে চাঁদা না পেয়ে গভীর রাতে বাড়িতে ঢুকে গুলি বর্ষণ!

গবেষণার গুণগত মান ও নৈতিকতা রক্ষায় যবিপ্রবিতে দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা

ভেজাল ও নকল পণ্যের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের ডাক

কোটচাঁদপুর মডেল প্রেসক্লাব সভাপতি বিএম ওয়াদুদের মাতার ইন্তেকাল

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *