মো. মাসুদ রানা (কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ):
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও নির্ধারিত দিনে সার না দেওয়ার প্রতিবাদে বিসিআইসি ডিলারের পয়েন্ট ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকেরা। পরবর্তীতে উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপে উত্তেজিত কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
আজ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালে উপজেলার জামাল ইউনিয়নের দুধরাজপুর গ্রামস্থ ডিলার পয়েন্টে এ উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে ঘটনা চলাকালে অভিযুক্ত ডিলার মো. শহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, জামাল ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার শহিদুল ইসলাম রবিবার সকালে কৃষকদের সার প্রদান করা হবে বলে পূর্ব ঘোষণা দেন। নির্ধারিত সময়ে শত শত কৃষক ডিলার পয়েন্টে ভিড় করলে গোডাউন বন্ধ রেখে জানানো হয়—গত শুক্রবার ও শনিবারেই সমস্ত সার বিতরণ সম্পন্ন হয়ে গেছে, আজ আর কোনো সার দেওয়া হবে না।
বিজ্ঞাপন
এ কথায় উপস্থিত কৃষকেরা চরম ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে কৃষকেরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে ডিলারের কর্মচারীদের সহযোগিতায় গোডাউনের তালা খুললে ভেতরে গোডাউনজাত করা গোপন ৬০ বস্তা সার দেখতে পান। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি রেজিস্টারে সাধারণ মানুষের নামে ভুয়া স্বাক্ষর ও ভুয়া ফোন নম্বর তুলে ডিলার শহিদুল খোলা বাজারে চড়া দামে এসব সার কালোবাজারি করে দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সেপ্টেম্বর চলতি আমন মৌসুমে ডিলার শহিদুলের নামে ৬৪ টন সারের বরাদ্দ ছিল, যার মধ্যে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই তিনি ৫৮ টন (প্রায় ১ হাজার ২০০ বস্তা) সার বাফার গোডাউন থেকে উত্তোলন করেন। গণমাধ্যমকর্মীরা ডিলার পয়েন্টে রাখা বিতরণ রেজিস্টার খতিয়ে দেখে জানান, সার গ্রহীতাদের তালিকার মাত্র ৫ শতাংশ নামের পাশে সচল মোবাইল নম্বর রয়েছে। সেখান থেকে র্যান্ডম ৯ জন কৃষকের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ১ জন সার পাওয়ার কথা স্বীকার করেন এবং বাকি ৮ জনেরই ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরাফাত জামিল বলেন, “খবর পেয়ে আমরা এসে গোডাউনে থাকা সার দ্রুত উপস্থিত কৃষকদের মধ্যে সমভাবে বিতরণ করছি। উপজেলা কৃষি অফিসের ব্যবস্থাপনায় আরও সার এনে কৃষকদের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিতরণ রেজিস্টারে কোনো জালিয়াতি বা অনিয়ম হয়েছে কিনা তা গভীরভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।”
চলতি আমন ধানের ভরা মৌসুমে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের সুষম সরবরাহ না পেয়ে জেলাজুড়ে কৃষকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর জেলার শৈলকুপার গাড়াগঞ্জ বাজারে সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ করে গাছের গুঁড়ি ফেলে বিক্ষোভ করেছিলেন স্থানীয় কৃষকেরা। ডিলারদের দাবি অনুযায়ী সার না থাকলেও খোলা বাজারে অতিরিক্ত টাকা ঢাললেই বস্তা বস্তা সার মিলছে বলে অভিযোগ চাষিদের।
যদিও ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. কামরুজ্জামান এবং কালীগঞ্জ বাফার গোডাউনের ইনচার্জ অহিদুর রহমান যৌথভাবে দাবি করেছেন, “জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ১০ হাজার ৩৭৩ মেট্রিক টন ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সরবরাহ মজুদ রয়েছে। কিছু স্বার্থান্বেষী অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে।”
অভিযুক্ত ডিলার শহিদুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা কালোবাজারির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “যে সার তুলেছিলাম তা নিয়ম মেনেই বিতরণ করা হয়েছে। রেজিস্টার দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।”
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুব আলম রনি জানান, ঘটনাস্থলে দ্রুত কর্মকর্তা পাঠিয়ে মজুদ সার বিতরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো ডিলার সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা করলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ছবি সংগৃহীত।

