মোঃ মাসুদ রানা, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে প্রায় ১৬ মাস স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একসাথে সংসার করার পর স্ত্রীর দায়ের করা ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের অভিযোগে রবিউল ইসলাম রবি (২৬) নামের এক ভ্যানচালক বর্তমানে জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠায়। তবে পুরো ঘটনাটি ঘিরে নানামুখী প্রশ্ন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
গ্রেপ্তারকৃত রবিউল ইসলাম রবি কালীগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর বারোবাজার ইউনিয়নের লুচিয়া গ্রামের ভ্যানচালক শুকুর আলীর ছেলে। তিনি ভ্যান চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন বাজারে মৌসুমি ফলের শরবত বিক্রি করতেন।
বিজ্ঞাপন
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়াবাড়িয়া গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ে ইতি খাতুনের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে রবির পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাদীর অভিযোগ, গত বছরের ২৫ আগস্ট বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে কালীগঞ্জের একটি ভাড়া বাসায় তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে রবির বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে অবস্থানকালে কাবিননামা ও বিয়ের কাগজপত্র চাইলে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তাকে রবির বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ইতি খাতুন ঝিনাইদহ আদালতে মামলা করলে আদালত সেটি কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশনায় ২১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে কালীগঞ্জ থানায় মামলাটি (মামলা নম্বর-১১, জিআর-১৭১/২৬) নথিভুক্ত হয়। পরবর্তীতে ২৪ আগস্ট রাত আনুমানিক ১টার দিকে বারোবাজার পুলিশ ক্যাম্পের একটি দল অভিযান চালিয়ে রবিকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়।
তবে অনুসন্ধানে বাদী ইতির বয়স ও বিয়ের প্রকৃতি নিয়ে বেশ কিছু দ্বিমুখী তথ্য পাওয়া গেছে। পরিবারের দেওয়া জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী ইতির বর্তমান বয়স ১৫ বছর ১ মাস হলেও মামলার এজাহারে তার বয়স ১৪ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।
আসামির বাবা শুকুর আলীর দাবি, উভয় পরিবারের সম্মতিতে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইতির বাবার বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করা হয়। মেয়ের বয়স কম থাকায় আইনি জটিলতার ভয়ে কোনো কাবিননামা করা হয়নি, তবে স্থানীয় এক ধর্মীয় ব্যক্তির মাধ্যমে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এরপর প্রায় ১৬ মাস তারা একসঙ্গে সংসার করেন এবং দুই পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তাদের কাছে বিয়ের অনুষ্ঠান এবং দম্পতির বিভিন্ন সময়ের ছবি সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া প্রতিবেশী আব্দুল্লাহ ও রবির বন্ধু রনি জানান, তারা প্রায় ৫০ জন বরযাত্রী নিয়ে কনের বাড়িতে গিয়েছিলেন এবং ধুমধামের সঙ্গেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। লুচিয়া গ্রামের প্রতিবেশী পারভীনা বেগম জানান, পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি ও শাশুড়ির সাথে কথা কাটাকাটির জেরে ইতির নানি তাকে নিয়ে যান এবং পরবর্তীতে এই মামলার খবর তারা জানতে পারেন।
অন্যদিকে, ইতির পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের আয়োজনের কথা স্বীকার করা হলেও কাবিননামা বা আইনি দলিল না দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। ইতির বড় বোন জানান, দুই এলাকায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হলেও রবি ও তার পরিবার কোনো কাগজপত্র দেয়নি। পরবর্তীতে রবি তার বোনকে ফুসলিয়ে সম্পর্কে জড়ায় এবং শারীরিক নির্যাতন করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। তবে এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ইতি খাতুনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চাইলে তিনি এটি পারিবারিক বিষয় উল্লেখ করে গণমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন জানান, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশে মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যেহেতু বাদী অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাই আইন অনুযায়ী পুরো বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে আসামি রবি বিচারিক আদালতের নির্দেশে কারাগারে রয়েছেন এবং তদন্ত শেষে প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হবে। ছবি সংগৃহীত।


