স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকে দুই ট্রাক পণ্য নিয়মবহির্ভূতভাবে ঢাকার সদরঘাট এলাকায় পৌঁছে যাওয়ার ঘটনা এবং কাস্টমস চত্বরে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে কাস্টমস হাউসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তার শাস্তির দাবিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা।
সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) কাস্টমস সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে গত রোববার (১১ অক্টোবর ২০২৬) বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আরমান স্বাক্ষরিত ওই লিখিত অভিযোগে কাস্টমস হাউসের যুগ্ম কমিশনার-২ শরফুদ্দিন মিঞার বিরুদ্ধে এই লাঞ্ছনার অভিযোগ আনা হয়।
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত ৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেডে নিজের দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করছিলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আরমান। সে সময় যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা তাকে নিজ কক্ষে ডেকে পাঠান। সেখানে উপস্থিত অন্যান্য কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাদের সামনেই তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এই আকস্মিক ও অবমাননাকর ঘটনায় চরমভাবে হতবিহ্বল হয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
বিজ্ঞাপন
এই অনভিপ্রেত ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কাস্টমসের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। এর প্রতিবাদে তারা পণ্য ছাড়করণ ও খালাস কার্যক্রম বন্ধ রাখেন, যার ফলে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে আমদানি পণ্য খালাস সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়। পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাঁর অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ কর্মচারীরা প্রয়োজনে কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার হুশিয়ারিও দিয়েছেন।
কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে, বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেডে মোট চার ট্রাক পণ্য সংরক্ষিত ছিল। এর মধ্যে থেকে দুটি ট্রাক বন্দর এলাকা থেকে নিরাপদে বেরিয়ে সরাসরি ঢাকার সদরঘাট এলাকার একটি গুদামে গিয়ে পৌঁছায়। পরবর্তীতে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) একটি দল অভিযান চালিয়ে সেই পণ্যগুলো আটক করে। আলোচিত এই চালানটির ম্যানিফেস্ট নম্বর ৬০১২০২৬০০৩০০৬২৬৫ এবং এর সঙ্গে ঢাকার সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিন ওয়ে ইন্টারন্যাশনাল’ ও যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আবিদ ইন্টারন্যাশনাল’ জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে।
বন্দর থেকে পণ্য বেরিয়ে যাওয়ার তথ্য জানার পরপরই যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা সরাসরি ৪১ নম্বর শেডে গিয়ে খোঁজখবর নেন। ওই নির্দিষ্ট শেডে পণ্য তদারকির দায়িত্বে ছিলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আরমান, ট্রাফিক পরিদর্শক মামুনুর রশিদ এবং সহকারী শেড ইনচার্জ আশরাফুল আলম। পণ্যগুলো কীভাবে বের হলো সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আরমান জানান যে তিনি অন্য একটি দাপ্তরিক কাজে অন্যত্র নিয়োজিত ছিলেন।
ঘটনার প্রকৃত সত্যতা উদঘাটনের স্বার্থে ৪১ নম্বর শেডের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন কাস্টমসের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, ঘটনার সময় ওই এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা সচল থাকলে তা যাচাই করেই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সিসিটিভি ফুটেজগুলো অবিলম্বে সংরক্ষণের জোর দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সেসময়ের দায়িত্বে থাকা সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বক্তব্য লিপিবদ্ধ করার দাবিও উঠেছে।
কাস্টমস অঙ্গনের সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কর্মস্থলে কোনো কর্মকর্তা কর্তৃক অন্য কোনো অধীনস্থ কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ উঠলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রশাসনিক তদন্ত করা বাধ্যতামূলক। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, আর অভিযোগ অসত্য হলে তাও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা জরুরি।
তবে অভিযুক্ত যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞার বিরুদ্ধে এর আগেও অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, ওই যুগ্ম কমিশনারের মনমতো বা নির্দেশিত পথে কাজ না করলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক চাপ ও বদলির মুখোমুখি হতে হয়।
শুধু কাস্টমস কার্যালয়ের ভেতরের কর্মীরাই নন, বেনাপোল স্থলবন্দরের স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলেও যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞাকে ঘিরে নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান ও আব্দুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন যে, বৈধ উপায়ে পণ্য খালাস ও কাস্টমস-সংক্রান্ত নানা দাপ্তরিক কার্যক্রমে তাদের প্রতিনিয়ত হয়রানি, ইচ্ছাকৃত জটিলতা সৃষ্টি এবং অসহযোগিতার শিকার হতে হয়।
এদিকে এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দ্রুত গাড়িতে করে কাস্টমস হাউস ত্যাগ করেন। ছবি সংগৃহীত।
