রফিক মন্ডল, ঝিনাইদহ থেকে ফিরে :
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটী ইউনিয়নে গ্রামীণ পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কর্মসূচির (কাবিখা) আওতায় বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ তছরুপ ও নজিরবিহীন দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে। ইউনিয়নের চারটি পৃথক ও গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের দুটিতে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে এবং বাকি দুটি প্রকল্পে বিন্দুমাত্র কাজ না করে মোট ১০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আত্মসাতের সরাসরি অভিযোগ উঠেছে ইউপি চেয়ারম্যান কাজী নাজির উদ্দীনের বিরুদ্ধে। এর আগে প্রতিবন্ধী স্কুল নির্মাণের সরকারি বরাদ্দ তছরুপের অভিযোগে অভিযুক্ত এই জনপ্রতিনিধির নতুন করে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ পকেটস্থ করার কাণ্ডে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় ভূক্তভোগী জনগণ।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সাধুহাটী ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামের মোমিনদের বাড়ি থেকে মোস্তপুর শ্মশানঘাট পর্যন্ত মাটি দিয়ে রাস্তা সংস্কারের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার বেহাল দশার কোনো পরিবর্তন হয়নি; লোকদেখানো অল্প কিছু মাটি ছিটিয়ে আগের মতোই দুর্ভোগে ফেলে রাখা হয়েছে পথচারীদের। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজের সুফল না মিললেও পুরো ৩ লাখ টাকাই উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।
একই ধরনের দুর্নীতির চিত্র দেখা গেছে সাধুহাটী পূর্বপাড়া ঈদগাহ মাঠ সংস্কার প্রকল্পে। বড় বড় খাদে ভরা উক্ত মাঠ সমান করতে অন্তত একশত গাড়ি মাটি প্রয়োজন থাকলেও কোনো কাজ না করেই ভুয়া ভাউচার তৈরি করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে জানান গ্রামবাসী।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে বড় জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে বংকিরা দাসপাড়ার এলজিইডি রাস্তা থেকে তেলবাটি মাঠ অভিমুখে রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে। ৫ লাখ টাকা বরাদ্দের এই বৃহৎ প্রকল্পে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মাটি ফেলে বাকি সমুদয় অর্থ গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে। উক্ত প্রকল্পে নিয়োজিত দিনমজুরের দেওয়া তথ্য মতে, সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক মিলে মাত্র ১৫ দিন কাজ করেছেন, যার মজুরিসহ মোট খরচ ৯০ হাজার টাকার বেশি হতে পারে না। ফলে অবশিষ্ট চার লাখেরও বেশি টাকা চেয়ারম্যানের পকেটে গেছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বংকিরা গ্রামের অধিবাসীরা।
অভিযোগ রয়েছে, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হোসনে আরা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নাসরিন সুলতানার পরোক্ষ যোগসাজশে ও কোনোপ্রকার সরজমিন তদারকি ছাড়াই বিল পাস করার সুযোগে এই হরিলুট সম্পন্ন হয়েছে।
এ বিষয়ে তদারকি ছাড়া বিল সই করার বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক ইউএনও হোসনে আরা নিজের দায় এড়িয়ে জানান, পিআইওর জমা দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতেই তিনি বিলে স্বাক্ষর করেছেন এবং সরাসরি সরজমিনে গিয়ে কাজ পরিদর্শনের সুযোগ তাঁর হয়নি।
অন্যদিকে সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে সাধুহাটীর ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী নাজির উদ্দীন দাবি করেন, মাটির কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, তবে কাজের মেয়াদ অনেক দিন অতিবাহিত হওয়ায় বর্তমানে হয়তো বোঝা যাচ্ছে না।
সরজমিন পরিদর্শন ছাড়াই কেবল টেবিল-রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে লাখ লাখ টাকার ফাইনাল বিল ছাড় দেওয়ার বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে স্থানীয় সুশীল সমাজ। জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ইউপি চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত ও কঠোর শাস্তিমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন এলাকার সর্বস্তরের মানুষ। ছবি সংগৃহীত।

